সুতোর টানে


সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ

salahuddin bhai Sutor tane book cover

লেখক পরিচিতি

আমেরিকার নোভা সাউথইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ মায়ামিসহ বেশ কিছু ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ডা. সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ মানব সেবার ব্রত নিয়ে চিকিৎসা পেশাকে বেছে নেন। দেশে এবং প্রবাসে তিনি তার পেশায় আন্তরিকতা এবং সততার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন।

তিনি কলেজ ছাত্র অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দী শিবিরে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। মুক্তিযুদ্ধে তার উদ্ভাবিত হাতে তৈরি সাইক্লোস্টাইল মেশিনে মুক্তিযুদ্ধের অনেক জরুরি এবং গোপন তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এই মেশিন পরবর্তী সময়ে তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। গবেষক ও আবিষ্কারক হিসেবেও দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। একজন মানুষের জীবন কতোটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে তার একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে এই বইটি। জীবনের দুঃসময়ে ভেঙে না পড়ে তা কাটিয়ে ওঠার প্রেরণা হিসাবে বইটি কাজ করবে। জীবনকে নিয়ে নতুন করে ভাবার অনেক উপকরণ ছড়িয়ে আছে সীমিত কলেবরের এই বইটির পাতায় পাতায়। ব্যক্তিজীবনে সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ একমাত্র মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে মায়ামিতে বসবাস করেন।

 

…………………………………………..

রুটস

 

সুতোর টানে

সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ

 

রুটস প্রকাশনা ০১

মুক্তিযুদ্ধ/আত্মজীবনী

 

প্রকাশক

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

রুটস

৭০ পাইওনিয়ার রোড

কাকরাইল, ঢাকা ১০০০

 

 

প্রথম প্রকাশ

১৬ ডিসেম্বর ২০১০

দ্বিতীয় প্রকাশ

১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

 

দাম

বাংলাদেশ: ১০০ টাকা

আমেরিকা অন্যান্য: 5 USD

 

Sutor Tane By Sultan S Ahmed

Publised by: Roots, 70 Pioneer Road

Kakrail, Dhaka 1000

cell: 01742 745 197

 

 

……………………………………………..

 

সর্গ

দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন

সেই সব শহীদদের প্রতি

এবং

যাদের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি

সেই আগামী প্রজন্মের প্রতি

 

……………………………………

 

একজন মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় তার জীবন। তবে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়।

আসলে জীবনের মানে কী?

জীবন মানে কি কেবল ছুটে চলা নাকি স্থবির হয়ে বসে থাকা?

জীবন মানে কি উপভোগ করা নাকি সব ত্যাগ করা?

জীবন মানে কি যুদ্ধ করা নাকি সব কিছু থেকে পালিয়ে বাঁচা?

জীবন মানে কি সংসারধর্ম পালন করা নাকি বিবাগী হয়ে চলা?

জীবন মানে কি পণ্য দাসত্ব নাকি প্রাণে শান্তি খুঁজে পাওয়া?

 

জীবন নিয়ে অনেক প্রশ্ন, অনেক চিন্তা সব সময়ই কাজ করে। আমরা কি আমাদের নিজের জীবন সবাই কাটাতে পারি?

জীবনে কখনো পূর্ণতা থেকে শূন্যতার জন্ম হয়। আবার কখনো শূন্য জীবন এক সময়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

আসলে জীবন অনেক বড় কিছু। জীবন হলো এমনই এক যাত্রা যা অনিশ্চিত ও অজানা পথে এক পরম কাঙ্খিত গন্তব্যে আমাদের পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেই চালককে আমরা দেখতে পাই না।

জীবন যাত্রার বিভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়ে ভাবি,কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি, কোথায় যাবো?

 

মহাকালের হিসাবে একজন মানুষের জীবনকাল বড়ই তুচ্ছ একটি বিষয়। তারপরও আমরা বাঁচতে ভালোবাসি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের চরিত্রের মতো চিৎকার দিয়ে বলতে চাই, জীবন এতো ছোট কেন?

 

এই ছোট জীবনে ঘটে যাওয়া বড় কিংবা ছোট ঘটনাগুলো, যেগুলো হঠাৎ এসে মনে জায়গা করে নেয় তাই এখানে তুলে ধরা হলো। এটা প্রচলিত অর্থে কোনো জীবনী গ্রন্থ নয়। লাইফ স্কেচ বা জীবন রেখাও একে বলতে চাই না। জীবন খাতায় অপটু হাতে আঁকিবুঁকি করার চেষ্টা করেছি শুধু। কোনো পাঠকের কাছে কোনো একটি মুহূর্ত যদি ভালো লেগে যায় তবে আনন্দিত হবো।

 

বিস্ময়ে জাগে প্রাণ

প্রতিটি মানুষের মতো আমিও অসহায় অবস্থায় পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছি। নতুন ভুবন আমাকে কতোটা মুগ্ধ করেছিল তা বলতে পারবো না। তবে জীবনযাত্রার শুরুর মুহূর্তটি থেকেই আমি কয়েকজন অসাধারণ যাত্রাসঙ্গী পেয়ে যাই। যারা কঠিন পৃথিবীর নির্মমতা ও কঠোরতা থেকে আমাকে সচেতনভাবে আড়াল করে রাখেন।

আমার জন্ম ৭ জুন ১৯৫৩। চট্টগ্রামে। নানার বাড়ি ছিল সেখানে। নানার বাড়ি মানে নানা সেখানকার ডিস্ট্রিক্ট কন্ট্রোলার ছিলেন। পরবর্তী সময়ে নানার বাড়িতে প্রায়ই আমরা স্কুল ছুটির সময়টি কাটাতে যেতাম। ছোটবেলার স্মৃতি বলতে গেলে ঐ বাড়ির স্মৃতিটাই আমার খুব ভালো লাগে। পাহাড়তলীতে রেলওয়ে স্টেশনের পাশে একটি পাহাড়ে ছিলো বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। তার পেছনে ছিল গির্জা আর গির্জার পাশে ছিল পানির ট্যাংক। সেখানে বিকাল বেলা যেতাম। পানির ট্যাংকে কান পেতে পানি আসার যে শব্দ হতো তা শুনতাম। সিঁড়ি দিয়ে পানির ট্যাংকের মাথায় উঠে যেতাম কখনো কখনো।

আমার মায়েরা ৬ বোন ৩ ভাই। অর্থাৎ আমার আটজন মামা খালা! তাদের সবার ছেলেমেয়েসহ সবাই যখন এক সঙ্গে হতাম তখন রীতিমতো একটা হাট বসে যেত। সারাক্ষণ হৈ চৈ করে মেতে থাকতাম আমরা।

নানা বাড়িতে ছিল বিশাল এক ডায়নিং টেবিল। নানা আমাদের সবাইকে নিয়ে বসতেন। তিনি বসতেন টেবিলের মাথায়। আমরা সবাই পাশ দিয়ে বসতাম। এতো বেশি আত্মীয় স্বজন ছিল যে খুব মজা হতো। সকালের নাস্তাটাও খুব মজার ছিল। হাতে তৈরি আটার রুটি একটা করে কপালে জুটত! আর সঙ্গে চা দেয়া হতো। আমরা চায়ের মধ্যে রুটি ভিজিয়ে খেতাম। এক রুটিতে আমাদের পেট ভরতো না। সবাই ক্ষুধার্ত থাকতাম। তাই চিন্তা করতাম রান্না ঘর থেকে কীভাবে আর একটা রুটি আনা যায়। আমরা তখন বিরাট এক দলের মতো ছিলাম। আমার দলের সদস্যরা আমাকে ভালো জানতো। একারণে বোনাস হিসেবে একটা বাড়তি রুটির অর্ধেকটাও ছিড়ে আমাকে দেয়া হতো।

তখন কেবল স্কুলে যাচ্ছি। বয়স পাঁচের মতো হবে। আমার প্রথম স্কুলের হাতেখড়ি হয় ভেড়ামারা স্কুলে। এটা একটা প্রজেক্টের স্কুল ছিল। আমার বাবা তখন কাজ করতেন একটা মিলে। তিনি তখন মিলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসার ছিলেন। বাবার কারণেই আমাদের ভেড়ামারা যেতে হয়েছিল। চট্টগ্রামে নানার বাড়ির পাশে একটা শিমুল গাছ ছিল। সেই শিমুল গাছটার পাশ দিয়ে ছিল পাহাড়ে নেমে আসার পথ। পাহাড়ে উঠতে আমাদের তখন কোনো অসুবিধাই হতো না। কিন্তু খেলার জায়গা ছিল পাহাড়টা। কাজেই পাহাড়ের পাশ দিয়ে আমরা গড়িয়ে গড়িয়ে নামতাম। ওটা আমাদের একটা বিরাট ফূর্তির বিষয় ছিল।

ওখানে রেলওয়ে হাই স্কুলে আমার মামা পড়তেন। মামা স্কুলে স্কাউটের সদস্য হিসাবে ড্রাম বাজাতেন। আমার মনে আছে তার কাছে স্কাউটের একটি ছুরি ছিল। সেই ছুরির মধ্যে অনেকগুলো জিনিস একসঙ্গে রাখার ব্যবস্থা ছিল। অনেকটা সুইস আর্মি নাইফের মতো। সেটা ছিল আমার স্বপ্নের ছুরি। মনে হতো ঐ ছুরিটা পেলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হবো। অনেকটা অ্যাডভেঞ্চার হিরোর অনুভূতি!

একটা বিশেষ ঘটনার কথা মনে পড়ছে। দিনটি অবশ্য আমার মতো অনেকেরই আতঙ্কের দিন। বিষয়টি হলো মুসলমানীর। সে কী যন্ত্রণা হাজমের হাতে! সেদিন সকাল থেকে হঠাৎ করে সবাই আমাকে খুব খাতির করছে। আমি অবাক হলাম কারণ যেখানে কে কোথায় আছে সেই খবর কেউ রখেছে না সেখানে আমার এতো খাতির কেন! তারপর হাজম আসল। হাত-পা বাধাঁর পর মনে হলো, একেবারে জল্লাদের মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। গ্রামে যেভাবে মুসলমানী হয় সেভাবেই হলো।

মনে পড়ে একবার আমার খুব অসুখ হয়। অসুখে প্রচন্ড জ্বর হয়। তখন কীভাবে জানি মামা জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর নুরুল ইসলামকে নিয়ে আসেন। তিনি তখন চট্টগ্রামে প্র্যাকটিস করতেন। আমি জেদ ধরলাম, কোনোভাবেই তার কাছে চিকিৎসা করাবো না। কান্নাকাটি অবস্থা। নুরুল ইসলাম সাহেব খুব বিপদে পড়ে গেলেন কারণ আমাকে তিনি দেখতে পেলেন না। তিনি ওভাবে দেখেই ঔষধ দিয়ে গেলেন। সে ঔষধ আমাকে হরলিকসের সঙ্গে বা দুধের মধ্যে দেয়া হতো। ঔষধ খাওয়াটা আমার জন্য তখন খুব কষ্টকর ছিল।

একবার একটা ঝড় হয়েছিল। প্রচন্ড ঝড়। ঝড়ের বেগে একটা আস্ত জাহাজ উড়ে এসে মাটিতে পড়েছিল। সেই সময় আমরা চট্টগ্রামের বাড়িতে ছিলাম। ঝড়ে টিনের চাল সব উড়ে গেল। বাড়ির একটু নিচে নানার পালা গরু ছিল। ঝড়ে নানার ঐ গরুর ঘরের চালও উড়ে গিয়েছিল। আমরা তো তখন আসলে এতো কিছু বুঝতাম না। এতোটুকু বুঝতাম যে খুব ফূর্তি হবে কারণ সারারাত ঝড় হবে। সবাই অস্থির হয়ে আছে। বাসায় সোফা ছিল। আমরা সেটার ওপর উঠে লাফালাফি করলাম, কেউ কিছু বললো না।

চট্টগ্রামে আমাদের কিছু ভারতীয় বাংলা বই ছিল। যেগুলো আমার খালারা পড়তেন এবং আমাদেরও পড়ে শোনাতেন। পাগলা দাশু-র কথা মনে পড়ে যেটি পড়তে এবং শুনতে বেশ মজা লাগতো। ট্রেজার আইল্যান্ড খুব প্রভাব ফেলেছিল আমার মনে। এগুলো আমি খুব ছোটবেলার কথা বলছি। রবিনসন ক্রুসো আমার খুবই ভালো লেগেছিল। কেমন করে নির্জন দ্বীপের মধ্যে একজন মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে। কতো সুন্দর করে সংসার গড়ে তুলেছিল সে। শ্রীকান্ত ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে বইয়ে রাতের বর্ণনা কখনো ভোলার নয়।

বাসায় মুরুব্বি বলতে তখন মা, খালা, মামা, নানা-নানি ছিলেন। আমার ডাক্তারি পাশ করার পরেও আমার নানা-নানি, দাদা-দাদি বেঁচে ছিলেন। এটা একটা বড় পাওয়া আমার জন্য। আমরা এক ছুটিতে যেতাম নানার বাড়ি আর এক ছুটিতে যেতাম দাদার বাড়ি।

দাদা ছিলেন খুব রাশভারী মানুষ। তার ওখানে চট্টগ্রামের মতো আনন্দ হতো না। সেখানে অন্য ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশ ছিল। দাদার বাড়ি ছিল রাজশাহী শহরেই। অলকা হলের সামনে। বাড়ির নাম ছিল প্রসন্ন ভবন। দাদার বাড়িটা ছিল অনেকটা প্রাসাদের মতো। এখন আর ওটা নেই।

আমাকে দাদা-নানা দু’জনই খুব ভালোবাসতেন। দাদার সঙ্গে এবং নানার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন দাদা অন্য সবাইকে যা বলতে পারতেন না তা আমাকে বলতেন। সাধারণত ওই সময়ের মুরুব্বিদের সঙ্গে এভাবে কথা হতো না।

একটা কথা আমার মনে আছে। আমি একদিন মাকে গিয়ে বললাম, আমার নাম সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ আকারে খুবই বড়ো। লিখতে অসুবিধা হয়। তাই ছোট করে দিলে ভালো হয়।

মা আমাকে বললেন যে নামটা তার দেয়া নয় এটা দাদার দেয়া। তিনি দাদাকে একথা বলতে বললেন। আমি দাদার কাছে গিয়ে আবদার করলাম, নামটা ছোট করে দিতে।

দাদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, তোমার নাম কী?

আমি তখন বললাম, আমার নাম সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ। আপনি এটা জানেন না?

দাদা তখন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার পুরো নাম আবু ফয়েজ সুলতান সালাহ্উদ্দীন আহমেদ।

আমি তখন এক দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, আমার নাম ছোট করার দরকার নেই। যা আছে তাই ভালো!

তখনকার দিনে নাম যতো বড় করা যায় ততো ভালো বলে ধরা হতো। আমার দাদা সাতটি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ডিপার্টমেন্ট অফ আর্কিওলজির ডিরেক্টর ছিলেন। দাদার নাম শামসুদ্দীন আহমেদ। তার মেধা ছিল প্রচুর। তার মেধা কতো ছিল বা তিনি কতো জানতেন তার একটা উদাহরণ দিইÑ

আমার চাচা নাজিমউদ্দিন আহমদও পরবর্তী সময়ে আর্কিওলজিতে বিখ্যাত হন। দাদার অনেক পাবলিশড আর্টিকল ছিল। আমি এটা একদিন চাচাকে বললে চাচা বললেন যে তোমার দাদার যে জ্ঞান তিনি এই আর্টিকলগুলো না লিখলে তা আমাদের পক্ষে কখনো করা সম্ভব ছিল না। চাচা নিজেও দাদার লেভেলে যেতে পারছেন না বলে আমাকে জানান।

দাদাকে দেখতাম শিলালিপি পড়তে। ইজি চেয়ারে বসে থাকতেন। ছোট্ট একটা রেডিও ছিল সেটা শুনতেন। অনেক মানুষ আছেন যারা সব সময় পড়াশোনা বা বই-পত্র নিয়ে পড়ে থাকেন। দাদা তেমন ছিলেন না। তিনি আমাকেও বড় মানুষের মতো সমান গুরুত্ব দিয়ে কথা বলতেন। একদিন মসজিদে মাওলানা সাহেবরা কথাবার্তা বলছিলেন। তাদের কথা শুনে এসে আমি দাদাকে গিয়ে বললাম, দাদা আপনি তো খুব বিদ্বান ব্যক্তি?

খুব ছোট ছিলাম, তাই দাদা খুব মজা করে হেসে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ… হ্যাঁ।

আমি তখন দাদাকে আগ্রহ নিয়ে বললাম, মসজিদে মাওলানা সাহেবরা বলছিলেন বেহেশতে হুরপরী আছে। হুরপরী কী জিনিস?

দাদা আমাকে বললেন, তুমি বসো। আরবি ভাষায় একটা শব্দের অনেক অর্থ আছে। আরবি ভাষার শব্দগুলো কেউ ভালো করে না বুঝে যদি সরাসরি অনুবাদ করতে যায় তাহলে এমন জিনিস দাঁড়ায় যার কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। তাই মাওলানা সাহেব যা বলেছেন তার ধারণা মতো তিনি এটার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু বেহেশতে কী আছে সেটা বোঝানোর মতো এমন কোনো উদাহরণ পৃথিবীতে নেই যা দিয়ে তুলনা করা যাবে।

উত্তরটা তখন বুঝিনি। আমি ভাবলাম একটা সোজা প্রশ্ন করলাম আর তিনি কতো কঠিন করে উত্তরটা দিলেন!

দাদাকে যখন জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সংবর্ধনা দেয়া হয় তখন আমি সঙ্গে ক্যামেরা নিয়েছিলাম ছবি তোলার জন্য। কিন্তু দাদা মাত্র দুই তিনটা কথা বলেই তার বক্তৃতা শেষ করে বসে পড়েন। বিষয়টা এতো দ্রুত ঘটে যে তার ছবি তোলার সুযোগ পেলাম না। মনে পড়ে দাদা সেদিন মঞ্চে খুব ছোট বক্তব্যে বলেছিলেন, আমি সারাজীবন যা করেছি সেটা কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশায় নয়।

পরে তার কাছে জানতে চাই, দাদা আপনি এতো সংক্ষেপে কেন বক্তব্য শেষ করলেন।

তখন তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন তা শুধু আমার জন্য নয়, সবারই মনে রাখার মতো। তিনি আমাকে বলেছিলেন, অহংকার হচ্ছে পতনের মূল। কোনো একটা কাজ করলে তার বিনিময়ে কোনো কিছু চেয়ো না। কাজটাই যেন তোমার আনন্দের জন্য হয় এবং সেটাই যেন তোমার জীবন হয়। জীবনে যারা কোনো কিছু করতে চায় তারা যেন এটাকে মেনে নেয় যে এটাই আমার জীবনের অংশ, কিন্তু’ তার বিনিময়ে যদি প্রাপ্তির প্রত্যাশা করো তাহলে চাওয়াটা বেড়ে যাবে।

 

আমার নানা এবং দাদা দুজনই দু’দিক থেকে খুব বড় ছিলেন। আমার নানা রিটায়ার্ড করার পর চট্টগ্রাম থেকে সৈয়দপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখানে তিনি নিজ হাতে বাড়ি করেন, ক্ষেত-খামার, চাষাবাদ করতেন। আমার কাছে খুব অবাক লাগতো যে মানুষ চট্টগ্রামের বিশাল বড় বাড়িতে খুবই ভালো ছিলেন তিনি অবলীলায় খুব সহজ জীবন বেছে নিলেন কীভাবে। আমি নানাকে দেখেছি নিজে মাটি মাথায় করে ফেলছেন।

আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন, চল মাছ ধরবো।

উৎসাহের সঙ্গে পুকুরে মাছ ধরতে যেতেন। পুকুরে কৈ ধরে ডাঙ্গায় এনে তিনি আমাকে ওটা ধরতে বলতেন। কিন্তু মাছ যেভাবে লাফাচ্ছে তা দেখে আমিও ভয় পেয়ে যেতাম।

আমাকে হেসে বলতেন, তুমি হলে শহরের ছেলে। গ্রামের কিছুই জানো না।

আমি বলতাম, আপনি শহরের মানুষ কিভাবে গ্রামের মানুষ হয়ে গেলেন!

নানা তখন আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করতেন, দেখো তুমি যেখানেই থাকো, নিজের তৈরি বাড়ি, নিজের ক্ষেতের খাবার এগুলোর মধ্যে যে আনন্দ তা তুমি অন্য কোথাও খুঁজে পাবে না।

আলেকজান্ডার পোপ তার ১০ বছরে বয়সে একটা কবিতা লিখেছিলেন। ছেলেবেলায় পড়েছিলাম। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, তিনিই হচ্ছেন সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি যিনি নিজ হাতে নিজের ক্ষেতে ফসল ফলিয়ে খাবার-দাবার করেন।

নানা সহজ সরলভাবে জীবন-যাপন করতে পছন্দ করতেন।

নানা এবং দাদা দুজনেই ছিলেন খুব বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আমার জীবনে তাদের প্রভাব খুব বেশি।

 

জীবন জিজ্ঞাসা

আব্বা ভেড়ামাড়াতে ওয়াপদার পাবলিক রিলেশনস অফিসার ছিলেন। তার পুরো নাম বদরুদ্দিন আহমেদ। সেই সময় ওখানে একটা স্কুল করা হয়েছিল। ভেড়ামারা প্রাইমারি স্কুল। সেখানকার শিক মোক্তার মাস্টার আমাকে হাতেখড়ি দেন। তখন আমরা চট্টগ্রাম থেকে ওখানে এসে থাকতাম। ভেড়ামাড়াতে আমরা তিন বছর ছিলাম। স্কুলের কথা শুধু এটুকুই মনে আছে ওখানে মার্বেল, ডাংগুলি খেলতাম।

পরবর্তী সময় ঢাকার মোহাম্মদপুরে নিউ কলোনিতে এসে আমররা উঠি। বাসার নাম্বার ১৪/১০। আমার জীবনে এই বাসাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্মৃতি বহন করে। এই বাসায় ছোট্ট দুটি ঘরে মামা-খালাসহ আমরা থাকতাম। ওই এলাকায় একটু বৃষ্টি হলেই কোমর পর্যন্ত পানি উঠে যেতো। বই-খাতা মাথায় নিয়ে চলতে হতো। নিজে নিজে পড়াশোনা করতাম তখন। প্রাইভেট টিউটর রাখার কোনো প্রশ্নই ছিল না। সম্ভবও ছিল না।

আমি সেখানে লালমাটিয়া স্কুলে ভর্তি হই। সেখানে ছিল কোএডুকেশন অর্থাৎ ছেলে মেয়ে একসঙ্গে পড়ানো হতো। লালমাটিয়া স্কুলে জাফর নামে আমার এক বন্ধু ছিল। এক পর্যায়ে আমরা ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন ল্যাবরেটরি স্কুল খুব নামকরা ছিল। আমরা ক্লাস সিক্সে পড়ি এসময়। ল্যাবরেটরি স্কুলে ঢোকার জন্য জন্য যে ভর্তি পরীক্ষা হতো সে পরীক্ষায় পাশ করে আমরা ঢুকতে পেরেছিলাম যেটা আমাদের জন্য বিরাট তৃপ্তির ব্যাপার ছিল। চাচার দুই ছেলে, আমি আর আমার ভাই আমরা মোট চার ভাই ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়তাম। স্কুলে খেলাধুলা করতাম। ক্রিকেট ভালো খেলতাম।

আব্বা তখন থাকতেন দেওয়ানগঞ্জের সুগার মিলে। মা থাকতেন ঢাকায় আমাদেরকে নিয়ে। আমরা যখন বড় হচ্ছি তখন বাসায় টেলিভিশন আসলো। আমাদের কলোনিতে কিছু বাড়িতে টেলিভিশন ছিল। আমরা তখন তাদের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে টেলিভিশন দেখতাম। তারপর বাড়িতে এসে মার খেতাম। বাসা থেকে বলতো, কেন তোরা গেলি টেলিভিশন দেখতে?

আমরা অন্যের জানালায় উঁকি দিয়ে যখন টেলিভিশন দেখতাম তখন তারা জানালা বন্ধ করে দিত। তবে টেলিভিশনটা না থাকাতে একদিক থেকে খুবই ভালো হয়েছে। আমাদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়নি।

বাড়ি থেকে কোনো সময় রাগ করে বেড়িয়ে গেলে আব্বা জানতেন কোথায় যাবো। কারণ আমার পালানোর একটাই জায়গা ছিল সেটা হলো লাইব্রেরি। তাই আব্বা আমাকে লাইব্রেরিতে খুঁজে পেতেন।

আমার মধ্যে পড়াশোনার একটা স্বভাব গড়ে উঠেছিল। স্বভাব বলছি এ কারণে যে তখন একটা ইন্টেলেকচুয়ালভাব এসে গিয়েছিল। ল্যাবরেটরি স্কুলে হায়দার আলী খান নামে এক ছাত্র ছিল সে এখন আমেরিকায় থাকে। আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। হায়দার মেট্রিক পাশ করার পর স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় চলে যায়। আরেক বন্ধু আনিস যার পুরো নাম আহমদ আনিসুর রহমান আমাদের মতোই নিউ কলোনিতে থাকতো।

আনিস আর আমি তখন একটা কাজ করতাম। যে কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলে তার সাইকোলজি বিশ্লেষণ করতাম। তারপর হতো কী অনেকটা হাত দেখে ভবিষ্যত বলার মতো কথাবার্তা বলে আনন্দ পেতাম। মোহাম্মদপুর বাজারে হাটের মধ্যে বসে চা খাওয়া ছিল আরেকটা আনন্দের বিষয়। আনিসের আবার হোমিওপ্যাথির ডাক্তারের কাছে যাওয়ার একটা রোগ ছিল। হোমিওপ্যাথির ডাক্তারের বাড়িতে তার মেয়ে হয়তো সুন্দরী ছিল সে জন্যই যেতো।

যখন লালমাটিয়া স্কুলে পড়ি তখন ওখানে সমস্ত জায়গাতে কোনো বিল্ডিং ছিল না। বাসার সামনে কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে মুখ ধুয়ে আমরা স্কুলে যেতাম। লেখার জন্য কাগজ কলম বেশি ছিল না। যে কাগজের ওপর লিখবো তাতে প্রথমে পেন্সিল দিয়ে লিখতাম পরে তার ওপর কলম দিয়ে লিখতাম। এতে একই কাগজে দুইবার লেখা যেত। এগুলো করতাম কাগজ বাঁচানোর জন্য। কাগজগুলো আনতাম প্রেস থেকে। প্রেসের নাম মনে নেই তবে সেখানে যে কাগজ বাঁচত সেগুলো আমরা নিয়ে আসতাম।

বন্ধু বাবুলের কাছ থেকে আমি বই নিতাম। আর আমার বইগুলো লিটন নিত। আমাদের ছোট বাসায় এমনও দিন গিয়েছে পড়তে যে বসব, তার জায়গা পাওয়া যেতো না। তখন রাস্তায় যে বাতি আছে ওখানে এসে পড়তাম। আমাদের বাড়িতে কোনোদিন দরজা বন্ধ থাকতো না। ফকির আসত কিন্তু চুরি হবে এ কথা তখন আমরা চিন্তাই করতে পারতাম না। ক্ষুধা লাগলে নিজের বাড়িতে যেভাবে যাই অন্যের বাড়িতেও সেভাবে চলে যেতাম। আমি আনিসের বাসায় যেতাম। আনিস আমার বাসায় আসত। সব বাড়ির দরজা সবসময় খোলা থাকত। খাবার নিয়ে কোনো ক্ষুন্তাই করতে হতো না। একজন হয়তো আর একজনের বাসায় খেয়ে আসতো। মনে হতো সবাই মিলে এক বিরাট সংসার। সত্যি কথা বলতে কী আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের পরে কলোনি ছেড়ে মোহাম্মদপুরের নিজের বাসায় চলে আসি তখন আমার মন খুব খারাপ ছিল। কারণ আমি দেখলাম আমাদের পাশের বাড়ির সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই।

 

সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

সৃষ্টির রহস্য জানার বিপুল আগ্রহ আমার শুরু থেকেই। কোন জিনিসটা কীভাবে হলো তা উল্টে পাল্টে না দেখলে মন ভরতো না। জহুরুল হক নামে একজন বায়োলজির টিচার ছিলেন। তার ক্লাসে একটি বিষয় আমার চিন্তা ভাবনাকে বদলে দেয়। বিষয়টা ছিল চোখ আর ক্যামেরা। চোখ কীভাবে দেখতে পায় আর ক্যামেরায় কীভাবে ছবি উঠে। তখন চোখ নিয়ে পড়ার সময় আমি খুব অবাক হতাম যে মানুষের শরীরে এতো জিনিস আছে! সে সময় অমি ফিজিক্সে খুব ভালো ছিলাম। একটা ইচ্ছে ছিল ফিজিক্স পড়ার। আইনস্টাইন, নিউটন এদের তখন খুব ভালো লাগতো। ল্যাবরেটরি স্কুলে তখন সায়েন্স ফেয়ার হতো। সায়েন্স ফেয়ারে প্রত্যেকবার আমি পুরষ্কার পেতাম। মনে পড়ে একবার বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার কাছ থেকেও পুরষ্কার নিয়েছিলাম। সে সময় প্রত্যেক স্কুল থেকে বিজয়ীদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বড় করে সায়েন্স ফেয়ার হতো।

তখন যেসব প্রজেক্ট করেছিলাম তার মধ্যে একটি হলো চুম্বক দিয়ে ডিসি রেন্ট যে কাঁটা ঘুরে অর্থাৎ দিক নির্দেশের উত্তর-দক্ষিণ, তার ওপর দিয়ে তার জড়িয়ে ব্যাটারি দিয়ে দিলে যে ইলেকট্রকাল সার্কিট হয় তাকে ম্যাগনেটটা চেঞ্জ হয় ওটা ছিল একটা প্রজেক্ট।

আরো ছিল, ফুলকে সিদ্ধ করার পর কনডেন্সড করে তার সুগন্ধীটাকে ধরে রাখা। এক ধরনের পারফিউম-এর মতো। কিন্তু এগুলো আমার মনে অতটা দাগ কাটেনি। কুদরত-ই-খুদা যেটাতে আমাকে প্রথম পুরষ্কার দেন তাতে তিনি বিচারক ছিলেন। এটা আন্তঃস্কুল কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়। আমার প্রজেক্টটা ছিল তিনটা বড় ড্রইং। যেহেতু আমি প্রতিবারই কিছু না কিছু করি, ওই বছরই আমার সামনে করার মতো কিছু ছিল না। অর্থাৎ দেখানোর মতো কোনো জিনিস ছিল না। সবাই যখন বড় বড় জিনিস বানাচ্ছে বা দেখাচ্ছে তখন আমি চুপ করে বসে থাকলাম। সবাই মনে করলো যে সালাউদ্দিন এবার শুধু বসে আছে। কিন্তু ড.কুদরত-ই-খুদা যখন কাছে আসলেন তখন আমি বলা শুরু করলাম। যে তিনটা কাগজ ছিল তাতে এঁকেছিলাম গাছ কীভাবে খাদ্য তৈরি করে অর্থাৎ ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়াটি। এটার সঙ্গে আমাদের খাদ্যের একটা তুলনামূলক চিত্র। অর্থাৎ গাছের জীবন এবং মানুষের জীবন। গাছ যে খাবার তৈরি করছে এবং কিভাবে তৈরি করছে। মানুষ খাবার খেতেও পারছে না, তৈরিও করতে পারছে না-এভাবেই আমি বক্তব্য রাখলাম। ওটার ওপর আমি ফার্স্ট প্রাইজ পাই।

আমার মনে আছে সবাই খুব অবাক হয়েছিল যে কীভাবে কোনো মডেল না করে তিনটা কাগজ দিয়ে ফার্স্ট প্রাইজ পেলাম!

সে ঘটনার একটা বড় প্রভাব আমার ওপর পড়ে এবং সায়েন্সের প্রতি আমার আকর্ষণটা আরো বেড়ে যায়। বায়োলজির ওপর পুরষ্কার পাওয়ার পর এবং পাশাপাশি জহুরুল স্যারের প্রভাবেও আমি বায়োলজির দিকে যাই। যদিও ফিজিক্সটা নিয়ে আমার রোমান্টিক চিন্তা ছিল।

 

স্বপ্নের গোল্লাছুট

স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার সাধ জাগার বয়সটিতে আমি অসাধারণ কিছু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হতো মানুষগুলোর কাছে যেতে পারা স্বপ্নকে স্পর্শ করার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলা!

আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় স্টার মার্কসসহ মোট পাঁচটি লেটার পেয়েছিলাম। এক নাম্বারের জন্য আর একটি লেটার মিস করেছিলাম। সেটা হলো সোশাল স্টাডিজ। আমি সায়েন্স গ্রুপ থেকে পাশ করি। ভালো রেজাল্টেন কারণে কলেজে ভর্তির জন্য আমার কোনো ইন্টারভিউ লাগেনি। এছাড়া তখন মজা করে বলা হতো, ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে পাশ করা মানে দেয়ালটা টপকানো! কারণ ল্যাবরেটরি স্কুল এবং ঢাকা কলেজ পাশাপাশি অবস্থিত।

ঢাকা কলেজে ঢোকার পর যেটা হয়, কিছু ছাত্র পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো ছিল। আমার মনে হতো পড়াশোনার গতিটা কিছুটা কমে গিয়েছে। কারণ স্কুলে থাকতে একটা ক্লাসরুমের মধ্যে ক্লাস হতো। ঢাকা কলেজে দেখলাম আমার কাসটা ওমুক রুমে হচ্ছে তো আরেক জনের ক্লাসটা তমুক জায়গায় হচ্ছে। আগে আমরা এক কাসেই বসতাম। শিক্ষকরা সব ঐ ক্লাসে আসতেন। ঢাকা কলেজে আমরা বিভিন্ন ক্লাসে যাচ্ছি এবং শিক্ষকরা সেই ক্লাসে যাচ্ছেন। এটা আমার জন্য একটু অসুবিধা হয়। মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হতো, দেখতাম বন্ধুরা কোন কাসে যাচ্ছে। তারা যে ক্লাসে যেত সেখানে আমার ক্লাস না থাকলেও অনেক সময় যেতাম।

প্রিয় শিকদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ক্লাসের পরও তার পেছন পেছন আমরা থাকতাম। স্যারের বাড়ি পর্যন্ত চলে যেতাম। ভাবীকে বিরক্ত করতাম। তখনও কিন্তু স্যারের অতো নাম হয়নি। টেলিভিশনে অনুষ্ঠানও শুরু করেননি।

একদিন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে দেখলাম কিছুটা মন খারাপ করে বসে আছেন। তার মুখে তখন আনন্দের ছাপ ছিল না। স্যারের এই মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে স্যার জানান, আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান স্যারের জায়গায় তাকে বসানো হয়েছে। কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সেখানে বসতে রাজি ছিলেন না। স্যার আমাদের বলেছিলেন শওকত ওসমান স্যারের যে মেধা, জ্ঞান, যোগ্যতা আছে শওকত ওসমানের উপস্থিতিতে সে চেয়ারে বসার যোগ্যতা বা ইচ্ছে তার নেই।

তখন আমি ভাবলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তো ভালো, তাহলে শওকত ওসমান স্যার না জানি কতো ভালো! যদিও শওকত ওসমান স্যারের কোনো ক্লাস আমাদের ছিল না। সায়ীদ স্যার কিন্তু সত্যিই তখন সেই চেয়ারে বসেন নি। আমাদের আদর্শ গঠনে এগুলো খুব সহায়ক ছিল। কলেজ জীবনের শিক্ষকদের মধ্যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কথা সব সময়ই মনে পড়ে। তার প্রভাব আমাদের ওপর ছিল অনেক বেশি। শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের সম্পর্ক ছিল খুব চমৎকার। অবশ্য তাদের খুব ভয়ও পেতাম। শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্ক ছিল পুরোপুরি বন্ধুত্বপূর্ণ।

আমি কলেজে এমনকি ল্যাবরেটরি স্কুলেও দেয়াল পত্রিকা করতাম, ওখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখতাম। বিশেষত কবিতা লিখতাম। তখন সবুজ পাতা, সবুজ সাথী পত্রিকা বের হতো। গুলিস্তানের এক জায়গায় আমরা জড়ো হয়ে কবিতা পড়তাম এবং ওখানে একজন মডারেটর থাকতেন। আমরা কবিতা পড়তাম সেটা নিয়ে আলোচনা হতো। অনেকটা পাঠচক্রের মতো। আনিস পড়তো, আমি পড়তাম। মোটামুটি সবাই পড়তাম।

ঢাকা কলেজে পড়ার সময় দৈনিক বাংলায় আমি একটি কবিতা পাঠিয়েছিলাম। ঐ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। তিনি আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে দেখছেন। আমি কবিতাটা তার হাতে দেইনি, পোস্ট করে দিয়েছিলাম। একদিন তিনি বাসায় এসে আমাকে বললেন, তুমি কবিতা লিখতে পারো।

কবি আহসান হাবীবের মুখ থেকে কথাটা শুনে আমি এতো খুশি হয়েছিলাম যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কবিতাটি তার সাহিত্য বিভাগের প্রথম পাতায় ছাপানো হয়েছিল। কবিতাটির শিরোনাম ছিল, এখনো ইচ্ছে হয় তোমাকে সরাসরি প্রশ্ন করি।

পুরো কবিতাটির মধ্যে কোনো প্রশ্ন ছিল না; কিন্তু পুরোটা পড়ার পরে প্রশ্নটা যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। একটা বিষয় আমি বর্ণনা দিচ্ছি কিন্তু বর্ণনাটা না জানিয়ে অনুভবের মধ্য দিয়ে পাঠককে জানাচ্ছি।

রেডিও বা টিভির প্রতি আকর্ষণ আমার ঢাকা কলেজ থেকেই। কেমন করে মনে নেই, রেডিও স্টেশনে নাটকের ভয়েস দিতে আমি যেতাম। আমি রেডিও নাটক করতাম, তারপর যুদ্ধের পর টিভিতে যাই।

কলেজে কোনো ইউনিফরম ছিল না। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতাম, অনেক সময় শার্ট-প্যান্ট পরতাম। ঢাকা কলেজে তখন চোষ প্যান্টের একটা প্রচলন শুরু হয়।

কলেজে তখন শুধুই দেয়াল পত্রিকাই নয় স্মরণিকাও বের হতো। কোনো সময় আমি সম্পাদক থাকতাম, কোনো সময় আনিস বা আলী ইমাম থাকতো। সেই সময় সবুজ পাতা বা সবুজ সাথী এরকম একটা পত্রিকা অফিসে যেতাম সেখান থেকে অনেক ভালো লেখক বেরিয়ে এসেছে। আনিসের পুরো নাম আহমদ আনিসুর রহমান, বিচিত্রার তুখোড় লেখক, ইন্টারন্যাশনাল পুল নিয়ে লিখত। ও যে এখন কোথায় জানি না।

ঢাকা কলেজে পড়ার সময় আড্ডার জায়গা ছিল নিউ মার্কেট। কলেজের এক্সট্রা কারিকুলামের মধ্যে খুব বেশি ক্রিকেট খেলতাম। বন্ধুদের মধ্যে প্যাথিওলজির মামুন ঢাকা মেডিকাল কলেজে আছে। সালাহউদ্দীন নামে আর একজন ছিল আমাদের সঙ্গে। ও প্রথম হয়েছিল। ওর সাথে বিয়ে হয়েছিল ফিজিক্সের ছাত্রী মিনুর। পাশ করার পর ওরা প্যারিসে চলে যায়। আমরা দুই সালাহউদ্দীন এবং মিনু কবিতা লিখতাম। সালাহউদ্দীনের এক বৈশিষ্ট্য ছিল। সে কবিতার প্রথম লাইনের প্রথম অক্ষর দিয়ে পুরো কবিতা লিখতো। যেমনÑ ‘অ’ দিয়ে শুরু হলে সব লাইনের শুরুতেই ‘অ’ থাকত। ব্যাপারটা ছিল খুবই মজার।

পরবর্তী সময় এই সালাহউদ্দীনই আমার হারানো চাচাকে প্রায় ২৫ বছর পর কানাডা থেকে খুঁজে বের করেছিল। এই চাচা বহুদিন ধরে আছেন কানাডাতে। পেশায় ডাক্তার, বিয়ে করেননি। ডাক্তার হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। কিন্তু কানাডা যাওয়ার পর কোনো এক অভিমানে আর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। তাকে পাবার পর তার কাছে যতোই জানতে চাওয়া হোক না কেন, তিনি কী কারণে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তিনি কোনো উত্তর দেন না, চুপ করে থাকেন।


দ্বিতীয় জীবন

মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জীবনও যে কতোটা তুচ্ছ হয়ে ওঠতে পারে তা নিজেই উপলব্ধি করলাম ১৯৭১ সালে। দেশের প্রতি ভালোবাসায় সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবন উৎসর্গ করেছেন তা হাজার পৃষ্ঠার বর্ণনাতেও বোঝানো যাবে না। আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত যে সময়টিতে আমরা জাতিগতভাবে তৈরি করেছি সেই সময়টিকে আমি কাছে থেকে দেখেছি। আমার পরম সৌভাগ্য সেই সময়টির পেছনে আমিও আমার ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি ঢাকা কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়তাম। পড়াশোনায় বেশ ব্যস্ত ছিলাম। আমরা তখন নিউ কলোনিতে থাকি। কী করবো, একটা কিছু করে কীভাবে দেশের ভালো করবো তা নিয়ে সব সময় চিন্তা করতাম। আমার বড় ভাই তখন ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। আমরা দুই ভাই। চিন্তা করলাম, আমিও যদি চলে যাই তাহলে মা বাবাকে কে দেখবে। তাই মা বাবার দিকে তাকিয়ে আমি থেকে গেলাম।

এই অবস্থায় থেকে কী করা যায় এমন চিন্তা ভাবনা সব সময় মনের ভেতর ছিল। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের নয় নাম্বার সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার মনোয়ার আলীর সঙ্গে পরিচয় হয়। শুরুতে আমরা নয় নাম্বার সেক্টরে মেজর জলিলের অধীনে ছিলাম। পরে আমাদের সার্টিফিকেট দেয়া হয় দুই নাম্বার সেক্টর থেকে। জেনারেল ওসমানীর আত্মীয় ছিলেন মনোয়ার ভাই। রামপুরার দিকে একটা জায়গায় তার সঙ্গে আমরা মিলিত হতাম। আমার ইচ্ছে ছিল মনোয়ার ভাই যেন আমাকে একটা কাজ দেন।

এসময় আমরা আলাপ করলাম মুক্তিযুদ্ধ ঠিকভাবে চালানোর জন্য প্রচার দরকার। এজন্য একটি ছাপার প্রেস প্রয়োজন। ডাবল ডিমাই প্রেস সব জায়গায় পাওয়া যেত। সেই মেশিন আমরা কিভাবে দখল নিতে পারি সে আলোচনা করি। তাহলে আমাদের লিফলেটগুলো ছেপে তা অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের হাতে দিতে পারবো। আমি অবশ্য তখন পর্যন্ত ডাবল ডিমাই মেশিন দেখিনি।

তাই সবাইকে বললাম আমাকে আগে মেশিনটি দেখাতে। তখনো সকলের চিন্তা ছিল কিভাবে মেশিন চুরি করা যায়। কিন্তু আমি আগে তা দেখতে চাচ্ছিলাম। তারপর আমি মেশিনটা দেখলাম। মেশিনটা দেখে বাসায় এসে আমি চিন্তা করলাম কিভাবে ছাপার মেশিনের বিকল্প বানানো যেতে পারে। যেটা করলে আমি অনেক ছাপাতে পারব কিন্তু কেউই দেখে কিছু বুঝতে পারবে না। আমি তখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলাম। এখন হয়তো মনে হবে এটা আমার মাথা থেকে বের হওয়া একটা বিস্ময়কর ঘটনা ছিল। এটা হয়তো আল্লাহর রহমত। আমি প্রেস সম্পর্কে তখন কিছুই জানি না। শুধু জানি কালি দিয়ে চাপ দিলে ছাপানো যায়।

আমি একদিন নিউ মার্কেটে গিয়েছি। গিয়ে দেখি যে একটা দোকান থেকে কিছু কাগজ ফেলে দেয়া হচ্ছে। আমি দেখলাম যে অনেকগুলো কাগজ, কিন্তু সাধারণ কোনো কাগজ নয়। তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা জানালো এটা হচ্ছে স্ট্যানসেল। তখন আমি প্রথমবারের মতো জানতে পারলাম ছাপানোতে স্ট্যানসেল বলে কিছু একটা আছে। স্ট্যানসেল হলো যেটা গেসটেটনার মেশিনে লাগানো হয়। লাগিয়ে কালি দিয়ে ছাপানো হয়। তখন আমি গেসটেটনার স্ট্যানসেল ডুপ্লিকেটর মেশিন কি তাই দেখেনি।

দোকানের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এসব ফেলে দিচ্ছেন কেন?

তিনি আমাকে জানালেন, এগুলো অনেক পুরোনো হয়ে গিয়েছে, ছাপার কোনো কাজে লাগে না। ডেট এক্সপায়েরড। তাই ফেলে দিচ্ছে।

আমি এগুলো নিয়ে যেতে পারি কি না অনুমতি চাইলে তারা সম্মতি জানালেন।

কাগজগুলো বাসায় নিয়ে আসলাম। শুরু হলো আমার গবেষণা।

ব্যক্তিগতভাবে এটা আমার প্রথম রিসার্চ। এভাবে একদিন এ কালি ও কালি ব্যবহার করে, ড্রাম কেটে তৈরি করলাম অদ্ভুত ধরনের একটা বিরাট মেশিন। যেটা নাকি ইচ্ছা করলে খোলা যায় আবার এক সঙ্গে লাগিয়ে ছাপা যায়।

ওখানে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করি । পিভিসি পাইপ ছিল কলোনির সামনে। সেগুলো রাতে কাটলাম। চট, স্পঞ্জ এবং ফ্যানেল ব্যবহার করেছিলাম। এই তিনটার কম্বিনেশনে কালিটা গেলে পরে কালিটা ওখানে আটকে থাকে এবং চাপ দিলে কালিটা আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে যখন কলম দিয়ে দাগ কাটলাম এবং দাগের ফাঁক দিয়ে কালি বেরিয়ে আসল এবং কাগজের মধ্যে ছাপাটা দেখলাম। খুবই উত্তেজনা এবং আবিষ্কারের একটা সত্যিকারের অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। তাহলে আমি পারবো। একটা কাগজে যদি আমি লিখি তাহলে সেটা অনেকগুলো কপি করতে পারছি।

এরপর কিছু কাগজ আমি লিখে ছাপালাম এবং মনোয়ার ভাইকে দিলাম।

আমি তাকে বললাম, আপনাদের মেশিন চুরি করার দরকার নেই। সেটা করতে গেলে অনেক মানুষ দরকার। তার চাইতে ভালো আপনারা যা ছাপাতে চান আমি ছাপিয়ে দেবো।

মুক্তিযুদ্ধে যে কাগজগুলো ঢাকায় বা বাইরে দেয়া হতো সেগুলো আমি বাড়িতে বসে ছাপতে থাকি।

মনোয়ার ভাই একদিন আমাকে বললেন, তুমি তো অনেক কিছু করছ।

আমি বললাম, না আমি কিছুই করিনি।

মনোয়ার ভাই বললেন, না তুমি অনেক কিছু করেছ। তোমার মেশিনটা আমরা দেখতে চাই। আমি বললাম, আপনি যা চান আমি সব ছাপিয়ে দিব কিন্তু মেশিনটা আমি কাউকে দেখাব না।

কারণ হচ্ছে আমার কাছে ভয় লাগলো, আমার এ মেশিন দেখতে তারা বাসায় আসবে। আর বাসায় আসলেই মা বাবা সব জেনে যাবেন। আর আশেপাশের লোকজনও তাদের দেখে ফেলবে।

প্রতিদিন আনুমানিক ৮০ কপি আমি করতাম। আমার হাত ব্যথা হয়ে যেত। বিলি করার সময় আমি কিন্তু ৭০-৮০ কপি একসঙ্গে বিলি করতাম না। কপিগুলো নিয়ে নিউ কলোনিতে একটি লন্ড্রিতে রাখতাম। দোকানের লোকটার কাছে আমি অল্প অল্প করে জিনিসগুলো রাখতাম। তিনি জানতেন না যে প্যাকেটের ভেতরে কী আছে। ওখান থেকে আমি আবার অন্য এক ছেলের কাছে জিনিসগুলো রাখতাম। সে আবার আর একজনকে দিতো। এভাবে এক একজনের হাতের মাধ্যমে যেত। ফলে কোথা থেকে জিনিসগুলো যাচ্ছে তা বোঝা যেত না। মনোয়ার ভাইয়ের লোক ওদিকে ছিল। তারা আবার বিলি করতো। এভাবে আমাদের টার্গেট ছিল পুরো ঢাকা শহর ছড়িয়ে দেয়া।

যখন আমরা কাগজ বিলি করতাম তখন আমার কাছে এটা যুদ্ধ বলে মনে হতো না। মনে হতো আমি অ্যাকশন রিলেটেড কিছু কাজ করছি।

আমার ড্রাইসেল এবং গ্রেনেডের ট্রেনিং আগেই ছিল। মুক্তিযুদ্ধ যখন প্রথম শুরু হয় সেই সময় মনোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে এগুলো শিখি আমি। আমাকে ইন্ডিয়া যেতে হয়নি। আমি মনোয়ার ভাইকে খুব অনুরোধ করতাম আমাকে একটা অপারেশন দেন। কাজ দেন। তিনি রাজি হন। অনেক পীড়াপীড়ির পর তিনি আমাকে ধানমন্ডি সাব পাওয়ার স্টেশনে গ্রেনেড হামলা করতে দেন।

আমি সফলভাবে গ্রেনেড হামলা করি। হামলা শেষে দৌড়ে আসার সময় দেখি আমাদের নিউ কলোনির নিচতলার চৌধুরী সাহেব পথে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি

শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছেন। পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। যা আমরা আগেই জানতাম। তিনি আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে রইলেন।

আমার মনে হলো বাসা থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে। বাসায় ঢুকেই কিছু কাপড়-চোপড় নিয়ে মগবাজারে চলে যাই কবি আহসান হাবীবের বাসায়। সে সময় তিনি মগবাজারে চলে গিয়েছেন। আমাকে তিনি ছেলের মতো দেখতেন। তার বাড়িতে আমি কিছুদিন পালিয়ে থাকি। কিছুদিন পর ভাবলাম, বাসায় গিয়ে মাকে বলে ইনডিয়া চলে যাবো। মা জানতেন আমি সাইক্লোস্টাইল মেশিন তৈরি করেছি এবং লেখা ছাপি। কিন্তু বাবা কিছুই জানতেন না।

২৩ জুলাই বাসায় আসার পর মা বললেন, আজকে রাতটা থেকে কাল চলে যাস।

পাকিস্তানিদের কাছে আমার বাড়ি ফেরার খবর চলে যায়। ওই রাতেই ক্যাপ্টেন ইসলামের নেতৃত্বে পাকিস্তানি আর্মি বাসা ঘিরে ফেলে। আর্মির হাতে আটক হই। আমি খুবই তাড়াতাড়ি বাসা থেকে বের হয়ে এলাম। কারণ আমি যদি না যাই তাহলে ঐ সাইক্লোস্টাইল মেনিশটা এবং ছাপার কোনো না কোনো কাগজ পেয়ে যাবে। তারা আমাকে পেয়ে বাড়ির ভেতর দেখলেও মেশিনটি যেহেতু খোলা অবস্থায় ছিল তাই কিছু বুঝতে পারেনি।

আমাকে ওরা ট্রাকে তুললো। গাড়িতে এসে রিজওয়ান নামের একটা ছেলেকে দেখলাম যে আমাদের সঙ্গে ঢাকা কলেজে পড়তো। পরবর্তীতে ওকে আমি আর দেখতে পাইনি। ধানমন্ডি থেকে আরও একটি ছেলেকে নিল।

ওরা প্রথমে নিয়ে গেল ছোট্ট একটা ঘরে। ছোট বাথরুমের মতো আকার। ওখানে ১৫-২০ জন লোক ছিল। বসার কোনো অবস্থা ছিল না কারণ বসতে গেলে জায়গা হবে না। বন্দিজীবনে কয়েকটি জায়গায় তারা আমাকে নিয়ে যায়। চোখ বেঁধে নিতো। তাই কোথায় যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারতাম না।

প্রথম নির্যাতন করার পর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে বেধে ওরা শাস্তি দিত। ওরা আমার পাঞ্জাবি খুলে নেয়, চুল ন্যাড়া করে দেয়। আমাদের চাবুক দিয়ে পেটাত। এক জায়গায় আর্মিরা দরজা দিয়ে ঢুকেই আমাদের মারা শুরু করতো। ওই রুমের পেছন দিয়ে কিছু ঘর ছিল। সেখান থেকে নির্যাতনের শব্দ আমরা পেতাম। এখানে অত্যাচারের অনেক ধরনের জিনিস ছিল। ছাদের উপর রড ছিল। রডের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে আমাদের পেটাতো। প্রায় সময়ই অজ্ঞান হয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে ছাদের পিলারের রডের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে পা ওপরে মাথা নিচে করে পেটাত। ওখানে যে দেয়ালটা ছিল সেখানে সমস্ত রক্তের দাগ লাগত। তারা কতো অত্যাচার করেছে। কখনো কখনো অফিসে নিয়ে গিয়ে ইলেকট্রিক শক দিত। মেঝেতে ফেলে মাথার ওপর বুট রেখে আমাকে জিভ দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করিয়েছে। বলেছে, বাংলাদেশ বানাও।

ছোট্ট একটা বাটিতে আমাদের লবন ছাড়া ভাত দিত। যারা রান্না ঘরে কাজ করার সুযোগ পেত তারা মাঝে মাঝে এক টুকরো পেঁয়াজ লুকিয়ে নিয়ে আসতো। তাদের ছিল সেটা সবচেয়ে আনন্দের খাবার! অত্যাচারে হাতের সমস্ত চামড়া উঠে গিয়েছিল। ভাত খেতে গেলে ভীষণ জ্বালা করত। আর সেই বাটিতেই আমরা পশ্রাব করতাম, পায়খানা করতাম।

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আমাদের ওপর যে অত্যাচার করা হতো তা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের যে সব ছবি আমরা দেখি তাকে হার মানিয়ে যাবে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের মারত। আমার এখনো মনে আছে, অজ্ঞান হওয়ার পরেও আমাকে ছাদের রডের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছিল।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আমাদের যে শেডে রাখতো তার বাইরে একটা পানির কল দিয়ে অল্প অল্প পানি পড়ত। ওটার নিচে সারি বেঁধে আমাদের নিয়ে যেতো। যখন পানির ট্যাপের নিচে যেতাম সঙ্গে সঙ্গে পেটানো আরম্ভ হতো। যেন বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে না পারি। এটাতেই ওরা গোসল বলত।

দশ বছরের একটা ছেলের কথা মনে পড়ে যাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়। অকথ্য নির্যাতনে তার ব্রেইন ড্যামেজ হয়ে যায়। ছেলেটি ছিল বোবা। আমাকে যখন প্রথম নিয়ে যায় তখন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে আমাদের মারত। আমাকে যতটুকু মারতো তার চেয়ে ওকে বেশি মারত। ওকে যখন মারত, তখন ও কোন কথা বলতে পারতো না। আমাকে মারার সময় কোনো প্রশ্ন করলে বোঝাতাম যে আমি কথা বলতে পারি। যেহেতু কথা বলছে না তাই মার খেতে খেতে আমার সামনে একদিন ওর নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। মারা গেল চোখের সামনে।

সারাদিন নির্যাতনের ফলে রাতের বেলায় একজন শুধু শব্দ করেছিলেন, আল্লাহ বলে । এ শব্দ শুনে রাতে আর্মিরা তাকে ধরে নিয়ে যায় চিৎকার করার অজুহাতে। তাকে নিয়ে গিয়ে মেরেছিল, তার মারের শব্দ আমরা শুনেছি। তারপর তাকে যখন আমাদের কাছে ফেলে দিয়ে যায় তখনও তার শরীর দিয়ে রক্ত ঝড়ছিল। তিনি আমার কোলেই মারা যান।

এখানে অত্যাচারের ধরণটা ছিল ঘরের মধ্যে আটকে রেখে কেউ লাঠি দিয়ে বা কেউ বেল্ট দিয়ে আমাদের মারত। একটা প্লেটে করে আমাদের খাবার দিত। এখান থেকে যখন কাউকে নিয়ে যেত কেউ কেউ ফিরে আসত, কেউ কেউ ফিরে আসত না। আমরা প্লেট গোনার পর বুঝতে পারতাম কতোজন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেন!

আমরা যে টিনের শেডে থাকতাম সেটাতে বাঁশের ক্ষেরা করা ছিল। আমি থাকতাম মাঝেরটায়। বাকি দুই পাশে আরো দুটো রোম ছিল অর্থাৎ মোট তিনটি। আমাদের সকাল বেলা কাজ করতে নিয়ে যেত। একে বলতো ওরা ফিল্ডওয়ার্ক। মিলিটারি কোয়ার্টারের আশে পাশে অনেক জঙ্গল ছিল। কাটাগাছে ভর্তি ছিল এলাকাটা। ওগুলো আমাদের খালি হাতে পরিষ্কার করতে হতো। এর ফাঁকেও লুকিয়ে সিগারেট খেতেন কেউ কেউ। যারা সিগেরেট খেতেন তাদের খুব আনন্দ দেখতাম। লাইন করে সবাই দাঁড়াতেন আর একটা টান মেরে একেক জন চলে যেতেন।

একবার আমাকে এক আর্মি অফিসারের বাড়ি পরিষ্কার করতে নেয়। কুকুরের মতো আচরণ করছিল তারা আমার সঙ্গে। বাইরের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার পর আমি বাড়ির ভেতরটা পরিষ্কার করছিলাম। এমন সময় সেই বাড়ির অফিসারের স্ত্রী হঠাৎ সেই রুমে ঢোকেন। সরাসরি তার চোখে আমার চোখ পড়ে যায়। তিনি স্থির হয়ে যান। তার চোখে অবিশ্বাস এবং ভীতি দুটোই দেখা যায়। তার চোখের সে চাহনি আমি কোনো দিন ভুলতে পারবো না।

বিপরীত কিছু অভিজ্ঞতাও হয়েছে আমার। একবার আমার জ্ঞান ফেরার পর দেখি ওখানকার যে সুবেদার মেজর বা প্রধান তিনি তার পায়ে আমার মাথাটা রেখে হাত বোলাচ্ছেন। তার মুখটা ছিল অনেকটা কুকড়ানো মাংশাসী বুলডগের মতো। তার চেহারা ছিল ভাবলেশহীন। আমি বেশ অবাক হলাম, তিনিই তো আমাদের মারেন। তাহলে এখন আবার হাত বোলাচ্ছেন কেন?

আসলে আমার মনে হয় তারাও আমাদের ফিল করতে পারতেন। অন্যায় কিছু যে তারা করছেন এটা হয়তো অনুভব করতে পারতেন। এটা না দেখলে বোঝা যাবে না যে মানুষ যত খারাপই হোক না কেন, তার ভেতরের মনুষ্যত্ববোধ কিছুটা হলেও বেঁচে থাকে। হয়তো ঐ লোকটাও মনে মনে চাচ্ছিল যে অন্যায় কিছু করা না হোক। তিনি ইংরেজি বলতে পারতেন না। তিনি ছিলেন খাস পাঠান। তার ভাবভঙ্গিতে বুঝতাম তিনি আমাকে ছেলের মতো ভালোবাসেন।

আমাদের যখন এমপি হোস্টেলে নিয়ে যায়, ওখানে অত্যাচার করে ফিরিয়ে দেয় তখন কিয়ানি নামে এক পাকিস্তানি সেনা অফিসার আমার ঘরে এসে বলতো, কেমন আছ।

আমি ঠিক বুঝতাম না। এটা কী সত্যিই অনুভব করতো নাকি চালাকি ছিল।

 

একজন লোকের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল যে সে আসলে বন্দী নয়। আমার সঙ্গেই তাকে রাখা হয়। আমি মাটিতে শুয়ে থাকতাম। সে প্রায় সময়ই বলতো, দেখো আমাকে ধরে নিয়ে আসছে। আমি এটা করি নাই।

অর্থাৎ সব সময় সে নিজের কথাই বলতো এবং আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করতো তুমি কি করেছো, কেন করেছো ইত্যাদি।

আমার কাছে মনে হচ্ছিল সে একজন পাকিস্তানি গুপ্তচর। ভেতরে ঢুকে তথ্য যোগাড় করছে। সে দুই-তিনদিন ছিল ওখানে। তৃতীয় দিন যাওয়ার পর আর ফিরে আসে নি। যাওয়ার আগে আমি তার হাত ধরে বললাম, দেখুন, আপনি বলতে পারেন আমার কেসটা কোথায়।

সে বললো, আমিও তোমার মতো বন্দী। আমি কি জানি?

আমি বললাম, আপনি যাই করেন, আমাকে খুন করবেন না।

তখন সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি তোমাকে একটা কথা বলে দিতে পারি। ওরা তোমার সম্বন্ধে কিছুই জানে না।

আমি বললাম, তার মানে কি?

সে বলল, ওরা তোমার সম্বন্ধে এখন পর্যন্ত কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। তোমার ওপর আরও নির্যাতন হবে, যদি তুমি কিছু জানো বলে দিও। আর যতণ পর্যন্ত তুমি কিছু না বলবে ওরা তোমাকে নির্যাতন করতেই থাকবে। কারণ ওরা তোমার কোনো সূত্র খুঁজে পাচ্ছে না। হয়তো তোমাকে মেরেও ফেলতে পারে।

 

আমাকে তার পরের দিন ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। ইলেকট্রিক শকের জন্য আলাদা ঘরে নিয়ে যেত, চেয়ারে বসিয়ে শক দিত। হাত পা বেঁধে শকের আগে এবং পরে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতো যাতে আমার বক্তব্য বদলে যায়। আমার কথা বদল হয়নি। তারপরের দিন সাদা মিলিটারির পোশাক পরা একজন অফিসার এসে আমাকে বললেন যে, এটাই তোমার লাস্ট চান্স। তোমাকে বলতে হবে যে তুমি কি করেছ?

উত্তর না পেয়ে আমাকে মারা আরম্ভ করলেন। আমি পড়ে গেলাম নিচে। তারপর দাঁড়াতে বলে আবার মার। আমাকে আবার দাঁড়াতে বললেন। আমি নিজেই দাঁড়ালাম। আবার মার। হঠাৎ তার চোখের দিকে তাকালাম। তিনি কী মনে করে মার বন্ধ করে দিলেন।

ওদের কাছে তথ্য ছিল আমি কিছু করেছি। কীভাবে করেছি, কোথায় করেছি এর কোনো খোঁজ বা অকাট্য প্রমাণ তারা পায়নি। আমি তখন নিজেকে এমনভাবে কন্ট্রোল করেছিলাম যাতে কেউ কিছু জানতে না পারে। সীমাহীন নির্যাতনের মধ্যেও আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের করতে পারেনি। এই শিক্ষাটা পরবর্তী জীবনে খুব কাজে এসেছে।

আমাকে একদিনের জন্য নিয়ে যায় সেকেন্ড ক্যাপিটাল অর্থাৎ সংসদ ভবনের ওখানে, এমপি হোস্টেল। এমপি হোস্টেলে নিয়ে আমাকে বলা হলো, তুমি বসে লিখো তুমি কি করেছিলে।

লেখার পরে একটা ঘরে নিয়ে গেল। ঘরটা খুব নির্জন ছিল। বাইরের কোনো শব্দ ঢুকত না। তারা আবার আমাকে নির্যাতন শুরু করলো যা পেরেছে তা দিয়েই।

ক্যান্টনমেন্টে বন্দি শিবিরে আমাদের আরেকটি কাজ ছিল। সেটা হলো কবর খোঁড়া। সেখানে অনেক লাশ ফেলতো তারা। একবার কবর খুঁড়তে হলো আমাদের নিজেদের জন্য। দিনটি ছিল ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।

কবর খুঁড়িয়ে সেখানে আমাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হলো। যখন ব্রাশফায়ার শুরু করবে এমন সময় প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি শুরু হলো। সারাটা আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। এর মাঝেই তারা ব্রাশফায়ার শুরু করলো। আমি কেমন করে যেন আগেই কবরে পড়ে যাই।

এটা ছিল সন্ধ্যার সময়। অন্ধকারে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলে মিলিটারিরা ভেতরে চলে যায়। তারা কবরে উঁিক দিয়ে আর পরীক্ষা করেনি কেউ বেঁচে গিয়েছে কিনা। যেহেতু জায়গাটা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর তাই কেউ পালাতে পারবে না এটা ওদের বিশ্বাস ছিল।

অন্ধকার আরো বেড়ে যাওয়ার পর ঝুঁকি নিয়ে আমি কবর থেকে বের হলাম। বিষয়টি মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি। আজও মনে হয় যে, আল্লাহর রহমতেই আমি বেঁচে এসেছি। নিজের শক্তি কিছু ছিল না। ভয় বা অন্য কিছুতে আমার কোনো অনুভূতি কাজ করছিল না। মাথায় তখন একটিই চিন্তা, আমাকে পালাতে হবে।

আমি নিজেকে সামলে গড়িয়ে গড়িয়ে বাইরে আসলাম। রাত পর্যন্ত পালিয়ে থাকলাম গাছের পাশে। এভাবে ধীরে ধীরে ক্যান্টনমেন্টের মেইন গেট পর্যন্ত আসলাম। যেটা এখন জাহাঙ্গীর গেট নামে পরিচিত। সেখানে খুবই ভয় পেলাম, কারণ আর্মিরা প্রতিটি গাড়ি সার্চ করছে। আমার মাথায় চুল নেই, গায়ে কাপড় নেই, শুধু একটা নেংটির মতো কাপড় রয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় আমি কোনো এক জায়গায় বন্দি ছিলাম। কি করে আমি ঐটুকু পথ পার হয়েছিলাম তা মনে হলে মাঝে মাঝে এখনো রাতে ঘুম হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি দেখলে যে রকম পালিয়ে আসার ভয়ের দৃশ্য দেখা যায়। সেই মুহূর্তে ঐটুকু পথ পাড়ি দেয়া ছিল আমার জীবনের অন্যতম কঠিন যাত্রা। দেয়ালে ছোট্ট একটা কাটা জায়গা ছিল যা দিয়ে লেবাররা যাওয়া আসা করত। মূল প্রবেশ দ্বারটা একটু বাঁকা ছিল। আমি মাঝামাঝি গতিতে চলতে চলতে কাটা জায়গাটা পার হতেই দেখি সেখান দিয়ে সবুজ রঙের একটা স্কুটার যাচ্ছে। যখন মোড় নিচ্ছিল তখন সেটা খুব স্লো হলো। আমি ঝাঁপ দিয়ে স্কুটারের মধ্যে পড়ে গেলাম। মিলিটারিরা তখন গাড়ি সার্চ করার ব্যস্ত ছিল বলে দেখতে পায়নি। স্কুটার চালক খুব দ্রুত চালিয়ে নিয়ে গেলেন এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি পালাচ্ছি।

আমি স্কুটার চালককে শুধু বলেছিলাম, জোরে চালান। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না।

তিনি একটি শব্দও করেননি এবং একবারও পেছনে ফিরে তাকাননি। আমি তাকে শুধু বলেছিলাম, আসাদ গেটের দিকে যান।

বর্তমান সংসদ ভবন পর্যন্ত আসার পর সিদ্ধান্ত নিলাম এই স্কুটার নিয়ে নিউ কলোনিতে আমার বাসা পর্যন্ত যাওয়া ঠিক হবে না। মিলিটারিরা নিশ্চয়ই আমাকে আবার খুঁজবে। ঠিক সেকেন্ড ক্যাপিটালের সামনে আমি তাকে থামাতে বলি। নেমে তাকে বললাম, দেখুন আমি আপনার নাম জিজ্ঞাসা করব না। আপনিও আমাকে আমার নাম জিজ্ঞাসা করবেন না। আপনাকে ভাড়া দেয়া আমার পক্ষে এখন অসম্ভব।

তিনি আমার কাছে পয়সাও চাননি। আমার নামও জিজ্ঞাসা করেননি। আমি আজো জানি না তিনি বেঁচে আছেন কিনা। তার চেহারাও এখন আমার মনে নেই। তিনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

তাকে বিদায় করে হেটে এলাম নিউ কলোনি পর্যন্ত। কলোনীতে ঢুকতেই পরিচিত লন্ড্রিটা ছিল। সেখানে গিয়ে বাসার খবর জিজ্ঞাসা করলাম। জানলাম বাসাতে আমার মা-বাবা কেউ নেই। আমি ফোনে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির ফলে বাবা মার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না।

আমার এক দূরসম্পর্কের নানা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইন্সুরেন্স কোম্পানি কাজ করতেন। আজিমপুরে তার বাসায় গিয়ে সবাইকে পেলাম। মিলিটারিরা যখন বুঝতে পারলো আমি পালিয়েছি, তখন আমাকে খুঁজতে এসে নিউ কলোনির বাসায় না পেয়ে বড় চাচার বাসায় যায়। আমি কোনো আত্মীয় স্বজনের বাসায় থাকলে তাদেরই সমস্যা হতে পারে- এই ভেবে আমি মাকে নিয়ে ট্রেনে করে রাজশাহী চলে গেলাম। রাজশাহীতে মায়ের এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে থাকলাম।

দেশ স্বাধীন হলো। সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। রাতে বেরিয়ে এসেছিলাম। একটা মাইক এবং রিকশা যোগাড় করলাম। মাইকটা যাদের কাছ থেকে নিয়েছিলাম তাদের কাছে চাওয়া মাত্রই চট করে দিয়ে দিল। পরে জানতে পারলাম দোকানের মালিকের ছেলেটি যুদ্ধে মারা গিয়েছিল।

তখন বাংলাদেশের পতাকায় সূর্যের ভেতর হলুদ রঙের ম্যাপ আঁকা ছিল। হলুদ কাপড়ের ম্যাপ কেটে হাত দিয়ে সেলাই করে আমরা পতাকা বানিয়েছিলাম। রাজশাহী শহরে প্রথম যে বিজয় মিছিলটা বের হয়েছিল আমি সেটাতে ছিলাম। বিজয় ঘোষণার পর আমি এবং মা ঢাকায় ফিরে আসি। এসময় আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমাদের বাড়িটা মিলিটারিরা দখল করেছিল এবং আমাদের বাড়িতে আমাদের নিজেদের ঢুকতেই খুব কষ্ট হচ্ছিল।

নিউ কলোনিতে ফেরার পর জানলাম মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা বিরোধীদের খুঁজছেন। তাদের মধ্যে নিউ কলোনির চৌধুরী সাহেবও ছিলেন।

এক সময় শুনলাম ৯ নম্বর সেক্টরের মনোয়ার ভাই তার বাহিনীসহ পুরো কলোনিকে ঘিরে ফেলেছেন চৌধুরী সাহেবকে ধরার জন্য। আমি মনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে ফিরে আসার পরপরই যোগাযোগ করেছিলাম। মনোয়ার ভাই কিন্তু তখন নিউ কলোনিতে থাকতেন না। তিনি মূলত থাকতেন রামপুরায় এবং সেখানেই ঘাটি করেছিলেন।

নিউ কলোনিতে আমি চৌধুরী সাহেবকে বললাম, আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে মারা হবে না। কিন্তু শর্ত হলো এখান থেকে আপনাকে চলে যেতে হবে।

তিনি বেঁচে থাকতে যে কোনো শর্তে রাজি বলে আমাকে জানান।

মনোয়ার ভাই বললেন, যে লোক তোমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছে তুমি তাকে কেন ছেড়ে দিচ্ছ।

আমি বললাম, আমার একটা প্ল্যান আছে।

মনোয়ার ভাই যখন আমার প্ল্যান সম্পর্কে জানতে চাইলেন আমি তখন বললাম যে আছে একটা প্ল্যান। আগে আপনি চৌধুরী সাহেবকে ছেড়ে দিন।

চৌধুরী সাহেবকে ছেড়ে দেয়ার কারণে মনোয়ার ভাই আমার ওপর রাগ করেছিলেন। আমি তাকে বোঝালাম যে স্বাধীনতা পেয়েছি মানে এই নয় যে আমরা যেভাবে অত্যাচারিত হয়েছিলাম ঠিক সেভাবে অত্যাচার করবো।

আমি তাকে আমার পরিকল্পনার কথা বললাম, আমাদের এখন একটা দায়িত্ব আছে। তা হলো মোহাম্মদপুরের মানুষগুলোকে সেভ করা। কারণ যুদ্ধের সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিহারিরা সবাই মোহাম্মদপুরে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা যতটুকু সম্ভব তাদের পাহারা দিয়ে রেখেছিলাম। তা না হলে অনেক বিহারি মারা পড়ত।

যুদ্ধের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন। এদেশটা খুব কষ্ট করে স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধ হয়েছে এবং যুদ্ধ যারা করেছেন তাদের মধ্যে যেমন বড় শিক্ষিত লোক ছিলেন তবে বেশির ভাগ ছিলেন এদেশের সাধারণ মানুষ। শুধু মুক্তিযোদ্ধা হলেই মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব নিতে হবে-এটা ঠিক না। অনেক মা-বাবা, ভাই-বোন আছেন যারা হয়তো অস্ত্র হাতে পাননি, ট্রেনিং পাননি তারা অনেকভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের উপকার করেছেন- এটা স্বীকার করা উচিত।

আমি নিজের কবর থেকে উঠে এসেছি। যুদ্ধের সময় মানুষের মৃত্যু আমার কোলো হয়েছে। আমি মৃত্যুর আগে মুখে পানি তুলে দিয়েছি। তাদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করে আমার কাছে ভাসে। মুুক্তিযুদ্ধের পরে তাদের কথা স্মরণ করেই মেডিকেলে পড়ার সময় কাউকে কিছু বলতাম না। কারণ এসব কথা ‘যুদ্ধ করেছি’ বলে আত্মঅহংকার হবে। এই জিনিসটি যেন আমার মধ্যে না আসে। আমি কী করেছি! তারা তাদের জীবন দিয়েছেন। এটা যে কতো কঠিন ও বেদনাদায়ক অনুভূতি তা বোঝানো অসম্ভব।

 

লাশ কাটা ঘরে

যুদ্ধের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম হয়েছিল। অচেনা ভাবনায় মন ভরে থাকতো। ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফিরে আসা কিংবা নিজেকে স্বাভাবিক রাখা খুব সহজ ছিল না বা সেটা করার চেষ্টাও করিনি। কেমন যেন একটি ঘোরের মধ্যে দিন কাটতো। তারপরও পড়াশোনা এবং ঢাকা মেডিকাল কলেজের ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে অনেকটাই নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিরাম।

ঢাকা মেডিকাল কলেজে ভর্তির ভাইবা বোর্ডে যখন গেলাম তখন সামনে বেশ কয়েকজন প্রফেসর ছিলেন। তখন সবেমাত্র যুদ্ধ শেষ হয়েছে। এক প্রফেসর আমার কাছে জানতে চাইলেন, যদি এবার ভর্তি হতে না পারো তাহলে কি করবে?

আমি বললাম, আবার আসবো।

তিনি আবারও বললেন, যদি সেবারও না হয় তাহলে?

আমি বললাম, তার পরেরবার আসবো।

এভাবে তিনবার বলার পর শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, হলো তো, এবার যাও।

আমি বললাম, যতোক্ষণ পর্যন্ত আপনি না নেবেন ততোক্ষণ পর্যন্ত আসতেই থাকবো স্যার।

ঢাকা মেডিকাল কলেজে চান্স পাওয়ার পর আমরা ফজলে রাব্বি হলে ঢুকি। ফিজিওলজির এক টিচার ছিলেন জালু ভাই। তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখার ঘটনাটা বেশ মজার। একদিন রাত প্রায় দুইটার দিকে জালু ভাই আমাকে ডাকতে লাগলেন, এই সালাহ্উদ্দীন, তুই কি ঘুমিয়েছিস… ঘুমিয়েছিস?

আমি ঘুম থেকে উঠে বললাম, ঘুমিয়েছিলাম কিন্তু এখন জেগে গেছি।

তখন তিনি আমাকে বললেন,ও আচ্ছা, তাহলে তুই ঘুমা।

এই ছিল তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ!

জালু ভাই পাশ করে গিয়েছিলেন তারপরও তিনি আমার রুমে থাকতেন। তার কিন্তু থাকার কথা নয়। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে ঝগড়া হলে আমাদের রুমের আর এক সিনিয়র ভাই ছিলেন যিনি তার জিনিসপত্র ফেলে দিতেন। জালু ভাই ওগুলো কুঁড়িয়ে নিয়ে আসতেন। তিনি বলতেন, রাগ করিস না আর মাত্র কয়েকটা দিনই থাকবো। তোদের সঙ্গে চলবো।

যেহেতু আমার কবিতা লেখার এটকু স্বভাব ছিল, তখন প্রেমিকাকে চিঠি লেখার প্রয়োজন হলে অনেকে আমার কাছে আসত। একই মেয়ে তখন দুটো ছেলের সঙ্গে প্রেম করছিল। এটা আমি জানলাম কারণ একই চিঠি একই ভাষায় আগেও আমি অন্যের নামে দেখেছিলাম।

মেডিকালে চান্স পাবার পর প্রথম দিকে পড়াশোনার দিকে ঝোঁক কমে গিয়েছিল। পরীক্ষার প্রায় ছয় মাস আগে আমি, হুয়ায়ুন, ওয়াহিদসহ আমরা কয়েকজন মিলে মিটিংয়ে বসলাম। আলোচনার বিষয়- যেভাবে এতোদিন পড়াশোনা করেছি, এখন পাশ আর হবে না।

আমি বললাম, যেভাবেই হোক পাশ করতে হবে। আর পাশ করতে হলে মরা কাটতে হবে। অর্থাৎ লাশ কাটতে হবে। কারণ প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় ফেল করলে সব শেষ! অ্যানাটমি না পড়লে হয় না। কিন্তু লাশ এমনি এমনি পাওয়া যাবে না। চুরি করতে হবে! যে কথা সেই কাজ। রাতে লাশ মর্গ থেকে বের করে চার তলায় তুলে কেটে-কুটে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবার সকালে রেখে আসতাম। সে সময় আমাদের জ্ঞানের অবস্থা এতো খারাপ ছিল যে লিভার ডান দিকে না বাম দিকে থাকে তাই জানতাম না।

কাশেম স্যার তখন ছিলেন অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের হেড। তিনি ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে মর্গে তালা ঝুলিয়ে দিলেন। আগে তো ভেতরে ঢুকতে পারতাম কিন্তু তালা দেবার পর তা অসম্ভব হয়ে পড়ল।

সেই সময়টাতে আমাদের ক্যান্টিনের মালিকের এক আত্মীয় এসেছিল। সে ছেলেটা আমাদের খুব পছন্দ করত। এর প্রমাণ পেতাম যখন আমরা সবাই মিলে চা-সিঙ্গারা খেয়ে বিল দেয়ার সময় সে বিল অর্ধেক বলত।

লাশ আনার জন্য আমাদের মোটা তাজা কাউকে প্রয়োজন ছিল, কেননা ছাদ থেকে দড়ি দিয়ে নেমে ওখান থেকে লাশ চুরি করতে হবে। এই কাজে সেই ছেলেকে কাজে লাগালাম। সে ছাদ থেকে দড়ি দিয়ে নেমে লাশ তুলে চার তলায় নিয়ে আসতো। আমরা ওখানে প্র্যাকটিস করতাম। এরপর পরীক্ষা হলো এবং অ্যানাটমিতে পাশ করলাম।

ক্লাসে আমাদের বন্ধু শহীদ ফার্স্ট বেঞ্চে বসার জন্য এতো পাগল ছিল যে, কেউ যদি তার সামনে বসত তাহলে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত। আমরা বসতাম লাস্ট বেঞ্চে। ফাস্ট রোতে শহীদ, খোরশেদ, লেবু এরা সবাই বসার জন্য অস্থির। আর আমরা পিছনে বসতাম বড় ভাইদের সঙ্গে। সেখানে অনেক ধরনের মজা হতো।

 

নিজেকে হারিয়ে খুঁজি

অনেক স্মৃতি মাুনষ ভুলে যায়। স্মৃতির ঘরগুলোতে ধুলো পড়ায় অনেক বড় স্মৃতিও লুকিয়ে থাকে মনের গহীনে। কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু পরিস্থিতি উপস্থিত হয় যে হারানো বিষয়গুলো ফিরে আসে। বেশ বড় ভাবেই ফিরে আসে।

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমার ইচ্ছা ছিল ফিজিক্সের প্রফেসর হওয়ার। কিন্তু আমি দেখলাম মানুষের এতো দুঃখ কষ্টের দিনে কে পাশে থাকতে পারে? সত্যি কথা বলতে কি এসব চিন্তা করেই ডাক্তার হই। যেটা আমার যুদ্ধের অনুভূতির মধ্যে ছিল। আমি মানুষের পাশে থাকব।

মেডিকালর ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত আমি চিন্তা করিনি যে, নতুন কিছু আমি করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছিল যুদ্ধের সময় আমি যেটা করেছি সেটা খুবই সামান্য ব্যাপার। এঁর মধ্যে এমন কিছু নেই।

ফোর্থ ইয়ারে আমি গিনিপিগের ওপর একটা রিসার্চের কাজ করি। আর এ কাজে আমাকে ফার্মাসি বিভাগের হেড হুমায়ুন হাই এবং মাযহারুল ইমাম খুবই সাহায্য করেছিলেন এবং অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। রিসার্চের কাজ করার সময় যুদ্ধের সময়ে তৈরি করা সাইক্লোস্টাইল মেশিনের কথা আমার মনে পড়ল এবং ভাবতে লাগলাম ওটা নতুন ছিল কিনা। আমার কাছে প্রমাণ দেওয়ার মতো কিছু ছিল না।

এক দিন আমি অবজারভার পত্রিকা অফিসে গিয়ে এক সাংবাদিকের কাছে আমি গিনিপিগ নিয়ে গবেষণার কথা বললাম। তিনি বিষয়টা নিয়ে ততোটা উৎসাহী হলেন না। কারণ এটার নিউজ ভ্যালু কম। তিনি জানতে চাইলেন, তুমি কি আর কিছু করেছ?

আমি বললাম, হ্যাঁ, যুদ্ধের সময় একটা সাইক্লোস্টাইল মেশিন বানিয়েছি।

তিনি বললেন, এটা একটা নিউজ।

আমি অবাক হয়ে বললাম,এটা একটা নিউজ?

তিনি জানতে চাইলেন আমি এই মেশিনের কথা কাউকে বলেছি কি না।

আমি বললাম, না।

যুদ্ধের সময় তৈরি সাইক্লোস্টাইল মেশিনের কথা বিস্তারিত তাকে বললাম। তিনি আমাকে বিশ্বাস করে পরের দিনই ওটা ছাপিয়ে দেন। এটা সম্ভবত ১৯৭৭-এর মে মাসের ঘটনা।

পরদিন আমি, এনায়েত ও অন্য বন্ধুরা মিলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান গিয়েছি ডা. কাজী জাফরউল্লাহ চৌধুরী একটি পুরষ্কার পাওয়ায় সাভারে অভিনন্দন জানাতে। আমরা গিয়ে তার কাছে নাম পাঠালাম। তখন উনি নিচে নেমে এলেন। তিনি হঠাৎ করেই জানতে চাইলেন, তোমাদের মধ্যে সালাহ্উদ্দীন কে?

আমি বললাম, আমি!

তিনি বললেন, তুমি মুক্তিযুদ্ধের সময় সাইক্লোস্টাইল মেশিন তৈরি করেছ? আমি তোমার নিউজ দেখেছি।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। তিনি কীভাবে জানলেন। দেখলাম সেদিনের অবজারভার পত্রিকায় আমার নামে বড় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তার কাছেই প্রথম ছাপা হওয়ার পেপারটা দেখি।

তিনি জানতে চাইলেন, মেশিনটা কি তুমি আমাকে তৈরি করে দিতে পারবে? আমি বললাম, নিশ্চয়ই পারবো।

তিনি আমাকে বললেন. তুমি এখানে থাক। তোমাকে মেশিন তৈরির টাকা দিব আর যেসব উপকরণ লাগবে আমি দেবো। তুমি বানাও।

তিনি আমাকে সব কিছুর ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে থেকেই আমি আবার একটা সাইক্লোস্টাইল মেশিন তেরি করি।

আলমাসী বলে একজন ছিলেন তিনি আমাকে বললেন, আপনাকে প্রেস কনফারেন্স করতে হবে।

তিনি আমাকে আরো বললেন, প্রেসক্লাবে চলেন, আমরা একটা প্রেস কনফারেন্স করব।

এরপর আমি প্রেসক্লাবে একটা প্রেস কনফারেন্স করি। সবাই দেখল ওটায় কীভাবে ছাপা হয় এবং এটার কী কোয়ালিটি। প্রেস কনফারেন্স করার পর পরদিন প্রায় সকল পত্রিকায় নিউজটা এসেছে। এটার বেশ ভালো একটা প্রচার হয়।

 

সকলে আমার সাইক্লোস্টাইল মেশিনের ব্যাপারে খুব আগ্রহী হয়ে পড়ে। ১৯৭৮ এ আমি মেডিকাল কলেজ থেকে পাশ করার কিছুদিন আগে কমনওয়েলথ-এর সায়েন্স অ্যাডভাইজার ক্রিশ্চিয়ান ডি লেট ঢাকায় আসলেন এবং আমার মেশিনটা দেখতে চাইলেন। সে সময় তার পক্ষে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে কিছু লোক আসেন। তারা আমার মেশিনটা ক্রিশ্চিয়ান ডি লেট-এর কাছে নিতে চাইলেন।

আমি তাদের কাছে কিছু সময় চাইলাম। পরে তাদের সঙ্গে আমি কথা বলব বলে জানালাম।

বিজ্ঞান জাদুঘরের ডিরেক্টর মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে গিয়ে বিষয়টা নিয়ে কথা বললাম। তিনি আমাকে বললেন, সালাহ্উদ্দীন এভাবে কোনো জিনিস বিদেশে দিয়ে দিও না। আগে স্বীকৃতিটা তোমাকে দিতে হবে। তোমার ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি যেন তোমার থাকে সেদিকে খেয়াল রেখো।

আমার ওপর খুব প্রেশার ছিল এটা বিদেশে দিয়ে দেয়ার এবং তারা আমাকে এটা বোঝাতে থাকে যে মেশিনটা বিদেশে দিয়ে দিলেই দেশের জন্য ভালো হবে।

আমি বললাম, আমি এটা করতে পারি না। কেননা এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা অংশ।

তখন ক্রিশ্চিয়ান ডি লেট আমার সাথে সরাসরি কথা বলেন।

তিনি বললেন, এটা ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার পর সবাই দেখে সন্তুষ্ট হলে মৌলিক আবিষ্কার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হবে।

আমি তাকে বললাম, এটা যদি স্বীকৃতি নিতে হয় তাহলে আমি নিজে ইংল্যান্ডে গিয়ে এটা করব। কিন্তু আমাকে ছাড়া আপনারা এটা করতে পারেন না।

তিনি এতে রাজি হলেন এবং মিনিস্ট্রির মাধ্যমে আমাকে যাবার ব্যবস্থা করলেন। তারপর মেশিনসহ আমি ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ড গেলাম।

মেলবোর্ন হাউসে অনুষ্ঠানটি হয়। স্যার ফিলিপ স্টুয়ার্ড এ সিদ্ধান্তটা নেন। তখন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি হিসেবে তারা এটাকে একটা ইনোভেশন হিসেবে ঘোষণা দিল। যখন এটার ঘোষণা হলো তখন বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়া থেকে সাংবাদিকরা এলেন। সারা বিশ্বে তারা এটা ব্রডকাস্ট করলেন। সে সময় আমাকে একজন জন বডিগার্ড দেয়া হলো। এরপর ইম্পেরিয়াল কলেজের আলী বাগদাদী এবং ITDG (Intermediate Technology Development Group) এগিয়ে আসে। ITDG -এর অর্থায়ন করতেন প্রিন্স চার্লস।

একদিন শুনলাম, প্রিন্স চার্লস আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।

প্রিন্স চার্লস মেশিনটা দেখতে আসেন এবং আমার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি মেশিনটা দেখে পছন্দ করেছিলেন এবং এতে অর্থ বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তিনি মেশিনটার ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বিস্তারের ঘোষণা দেন।

ইম্পেরিয়াল কলেজ অফ টেকনলজি আমার আবিষ্কারের ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখালো। তারা আমাকে বলল যে যেখানে বই, খাতা বা এ ধরনের সুবিধা নেই সেখানে তুমি তোমার এ টেকনলজিটা প্রয়োগ করতে পারবে।

আমি জানালাম যে আমি এ মেশিনটা অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তৈরি করিনি। আমি এটা মানুষের উপকারের উদ্দেশ্যে তৈরি করেছি। তাই যদি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের উপকারে এটা লাগে তাহলে এটাকে ব্যবহার করুন।

আমি এই আবিস্কার থেকে কোনো অর্থ নেইনি এবং আজো এটি পৃথিবীর বিভিন্ন স্বল্প আয়ের দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আমাকে ইংল্যান্ডে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হলো। কিন্তু আমি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।

কারণ জানতে চাইলে বললাম, আমার দেশ খুব ভালো, দেশে কিছু করা দরকার।

সে বছরই আমি বৃটেন থেকে বাংলাদেশে চলে এলাম।

আমি কাউকে কিছু জানাইনি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেক্রেটারি আমাকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার দাওয়াত দেন।

আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে গিয়ে দেখলাম আমার আবিষ্কার, অর্জন সবকিছু সম্পর্কেই তিনি অবগত। তিনি বললেন, এটা আমাদের প্রয়োজন। দেশের সবখানে এটা ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি মন্ত্রীদের ডাকলেন। শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ আরো অনেককে। তারা সকলেই সেখানে আসলেন এবং ওই মুহূর্তেই পাঁচশো টাকা করে প্রতিটি মেশিনের দাম ধরে ৪৩৫২টা মেশিনের অর্ডার দেয়া হলো। তিনি মেশিনটাকে প্রতিটি থানায় থানায়, গঞ্জে-গঞ্জে, স্কুলে কলেজে পৌছানোর ঘোষণা দিলেন।

আমি বললাম, আমি একজন ডাক্তার। এতগুলো মেশিন প্রডিউস করার সময় আমার কোথায়। আর একা কীভাবে করবো।

তিনি আমাকে সব ধরনের সাহায্য-সযোগিতার আশ্বাস দিলেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে মেশিনটি দেখানোর পর তিনিই ছিলেন প্রশাসনের প্রথম ব্যক্তি যিনি এটার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।

এরপর আমি ড. কুদরত-ই-খোদার ছেলে মঞ্জুর-ই-খোদার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করি। কিন্তু কিছু দিন পর জিয়াউর রহমানকে মেরে ফেলা হলো। তখন আমি খুব ব্যথিত এবং হতাশা হয়ে পড়ি এবং এটার ভবিষ্যত সম্পর্কে চিন্তিত হয়ে যাই।

 

জীবন শিক্ষক

শিক্ষার কোনো শেষ নেই। বইয়ের শিক্ষায় হয়তো একটি পর্যায় পর্যন্ত জানা যায়। জীবন থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা অমূল্য। একজন সাধারণ মানুষও অনেক অসাধারণ শিক্ষক হিসাবে উপস্থিত হন।

ডাক্তারি পাশ করার পরে আমি যখন প্রথম মেডিসিনের কাজে যোগ দিলাম, ইউসুফ আলী স্যার তখন মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন। তখন ক্যাজুয়ালটি মেডিসিন বলে মেডিসিনের একটি ইউনিট করা হয়। সেখানে মবিন স্যারকে নিয়ে আসা হয়। মবিন স্যার তখন পিজি হাসপাতালে নুুরুল ইসলাম স্যারের সবচাইতে প্রিয় ছাত্র ছিলেন। পাশ করার পর ওনাকে ক্যাজুয়ালটি মেডিসিনে একটি পজিশন দেয়া হয়। আমি তখন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ছিলাম। কোনো রকমে চেষ্টা করে ওখানে আসলাম। সিএ হলাম, তখনকার দিনে সিএ একটা বড় পজিশন ছিল। তখন ইউসুফ আলী স্যার রাউন্ডে বেরিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। তৃতীয় বর্ষে, চতুর্থ বর্ষের সবাই আছে। সবাই চুপ করে আছে।

স্যারের নির্দেশে আমি একজন রোগীর ডান দিকের হাতের পালস দেখছি। সেদিন খুব সুন্দর করে সেজে এসেছিলাম। আমি রোগীর এ হাত ও হাত, পায়ের সব জায়গার পালস দেখছি। কিন্তু পাচ্ছি না। আমার সারা শরীর দিয়ে ঘাম ছুটে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম, স্যার নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি তো পালস-ই পাই না, পেশেন্ট ম্যানেজ করব কীভাবে।

কিছুক্ষণ পর স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি ভাবলাম কিছু একটা মিথ্যা বলে দেব। আবার মনে হলো, আমি এতদিন মিথ্যা বললাম না, আজ স্যারের কাছে মিথ্যা বলব। এটা কেমন কথা। আমি তখন ভাবলাম বাবা রিটায়ার্ড করেছেন। আমাকে তো চাকরি করতে হবে। মুখ থেকে আসছে মিথ্যা কথা, আবার মনে হচ্ছে মিথ্যা বলব না।

স্যার যখন জিজ্ঞাসা করলেন আমি ভয়ে ভাঙ্গা গলায় বললাম, স্যার আমি তো পালস পাইনি।

স্যার আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেনÑ কনগ্রেচুলেশনস! তুমি আমার কাজ করবে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি তো পালসই পেলাম না।

স্যার আমাকে বললেন, এই পেশেন্টের পালস নেই।

স্যারকে বললাম, ৩৫ বছরের মহিলা, তার পালস নেই এটা কেমন কথা।

স্যার আমাকে জানালেন এই অসুখটার নাম হলো টাকাসাসুস ডিজিস। কানেকটিভ টিসু ডিজঅর্ডারের কারণে এই রোগ হয়। এই রোগটা এশিয়া কন্টিনেন্টে একমাত্র পাওয়া যায়, তাও খুব কমই পাওয়া যায়।

আমি পরবর্তী সময় আমেরিকায় আমার ছাত্রদের বলেছি, কোনোদিন মিথ্যা বলবে না। পেশেন্টের যা পাচ্ছো তাই বলবে, তাহলে হয়তো কোনোদিন প্রমোশন পেতে পারো! তোমাকে তারা ভালো বলবে। কোনোদিন যদি কোনো কিছু না পাও তাহলে যে কিছুই পাওনি তাই বলবে, কিন্তু মিথ্যা বলবে না। তুমি যে অসুখটা সম্পর্কে জান না তা অন্য কেউ জানবে।

 

আরেকটি কথা মনে পড়ছে। তখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ চলছে, ছাত্রদের তখন এর ওপর কিছু বলার জন্য বলতে বলা হলো। ঐ সময় আমাকে বলা হলো এটার ওপর লেখার জন্য। আমি বললাম, আমি কিছুদিনের জন্য বাড়িতে যাব। কারণ আমি তখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর কিছুই জানি না।

আমি একেবারে অজোপাঁড়াগায়ে চলে যাই। এক অপরিচিত কৃষকের বাড়িতে রাত কাটাই। তাকে আমি জানালাম যে আমি শহর থেকে এসেছি। আমি জানতে চাই, আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?

তিনি জানালেন তার ছেলেমেয়ে দশজন।

আমি তাকে বললাম, আপনার ছেলেমেয়ে যেহেতু দশজন তখন তো আপনার খুবই কষ্ট।

আমি ফিরে আসি। ১৯৭৭-এ আমি এর ওপর একটা লেকচার দেই। আমি বললাম, যার দশটা ছেলে মেয়ে আছে তিনি আমাকে বোঝালেন তার তিনটা   সন্তান মারা যাবে, এক জন শহরে যাবে, আর একজন হয়তো বিয়ে করার পর অন্য জায়গায় চলে যাবে। তাই সব মিলিয়ে যদি দুই তিনটা থাকে সেটাই তার সম্পদ। তিনি তাদের দিয়ে ক্ষেতে কাজ করাবেন। তিনি আমাকে আরো জানালেন দরকার হলে তার ছেলেমেয়েদের মসজিদে কোরআন শরীফ পড়তে পাঠাবেন কিন্তু তবুও স্কুলে পাঠাবেন না।

আমি এর কারণ জানতে চাইলে তিনি জানালেন, স্কুলে গেলে তো আপনার মতো জুতা জামা চাইবে।

চাঁদের কোলে রোদ

বিজ্ঞান আমাদের জানার ক্ষেত্রকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তারপরও বিপুল প্রকৃতির কতোটুকু রহস্য আমরা ভেদ করতে পারি। এই জানা এবং অজানা জগতের মধ্যে প্রকৃতি আমাদের নিয়ে খেলে চলেছে।

বাংলাদেশে সর্বশেষ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ২০০৯ সালে দেখা গেলেও ঢাকায় বসে সর্বশেষ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায় ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮০ সালে। ১৮৯৮ সালের পর ৮২ বছর পর ঢাকায় এবং বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গা থেকে তখন এই সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। পরবর্তী প্রায় শতবছরে ঢাকা থেকে এমন দৃশ্য আর দেখা যাবে নাÑ এ কথা জেনে আমি একটি পরীক্ষা করতে চাইলাম। অমার জানার আগ্রহ হলো সূর্যগ্রহণে মানবদেহে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি না এবং হলে সেটা কী ধরনের।

সূর্যগ্রহণ জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে নানাভাবে প্রকৃতিতে প্রভাব ফেলে। একথা পরীক্ষিত সত্য যে, জোয়ার-ভাটায় মানব শরীরে অনেক পরিবর্তন আনে। ঘুম, ব্লাড প্রেশার, পালস, দেহের তাপমাত্রা সবই জোয়ার-ভাটায় প্রভাব ফেলে। এর কারণ খুঁজলে দেখা যায়, মানব কোষের পানির ইলেকট্রোলাইটের সঙ্গে সমুদ্রের পানির মিল আছে। মানব দেহে শতকরা ৯৫ ভাগ পানি। ফলে জোয়ার-ভাটায় একটা সরাসরি প্রভাব মানবদেহে পড়ে।

আমি চিন্তা করতে থাকি প্রকৃতির সঙ্গে এই সুবন্ধনের ফলে সূর্যগ্রহণও মানবদেহে প্রভাব ফেলতে পারে। এই চিন্তা থেকেই ইন্সটিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চের কাছে আমার চিন্তার বিস্তারিত বর্ণনাসহ পরীক্ষা করার প্রস্তাব করলাম। আমাকে পরীক্ষা করার অনুমতি দেয়া হয়। নিজ খরচে এই পরীক্ষা শুরু করে দিই।

আমি প্রথমেই ডাক্তার, মেডিকালের ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশার ১৯ থেকে ২৫ গড় বয়সের একটি গ্রুপ তৈরি করে ফেলি। আরেকটি গ্রুপে কয়েকজন সিনিয়র ব্যক্তিও ছিলেন। প্রায় আশিজন ব্যক্তিকে তিনদিনের জন্য পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হলো। তাদের প্রত্যেকের তিনবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। একবার সূর্যগ্রহণ শুরু হওয়ার একদিন আগে, সূর্যগ্রহণ চলার সময় এবং সূর্যগ্রহণের পরদিন। রক্ত পরীার ফলাফলে দেখা যায়, পরীক্ষাধীন ব্যক্তিদের শরীরে বড় কোনো ধরনের পরিবর্তন না এলেও রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে গিয়েছে।

এর কারণ তখন বের করা সম্ভব হয়নি। কারণ তখন দেশে যেসব যন্ত্রপাতি ছিল তা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না।

পরবর্তীতে এই গবেষণা নিয়ে ডা. এম কাশেমউদ্দিন ও ডা. শুভাগত চৌধুরীর সঙ্গে আমার যৌথ লেখা প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে। লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘এফেক্ট অফ সোলার ইকিপস অন হিউম্যান বডি: এ বায়োকেমিকাল স্টাডি’।

পরীক্ষাটি করেছিলাম একেবারেই তরুণ বয়সে। এটা কোনো চূড়ান্ত রায় দেয়ার মতো পরীক্ষা ছিল না। আমি আশা করবো ভবিষ্যতের তরুণ চিকিৎসকরা এই বিষয়ে আরো ভালো যন্ত্রপাতি নিয়ে গবেষণা করবেন। আমার চেষ্টা ছিল নতুন কিছু খুঁজে দেখার। আশা করি তারাও তাই করবেন।

 

আপন আলো

প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা অনেক সমস্যা থেকে রক্ষা করে। অবশ্য এই পদ্ধতি সবাই সমর্থন করবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, তবে মূল বিষয় হলো নিজের কাজটি ঠিকমতো চালিয়ে নেয়া। এবং নতুন কিছু করা থেকে বিরত না থাকা।

ডা.মবিন খান ছিলেন আমাদের ইউনিটে। ইমার্জেন্সি রুমের ওপর থেকে প্রেশার কমানোর জন্য তখন এ ইউনিটটা করা হয়। ইমার্জেন্সি পেশেন্টদের দ্রুত অ্যাডমিট করার জন্য সপ্তাহে তিনদিন রোগী ভর্তি করা হতো। যখন কোনো পেশেন্ট অ্যাডমিট হতো তখন আমাদের দায়িত্ব ছিল তার চিকিৎসা করা ও রিলিজ করা। এখন যদি কারো বুকে ব্যথা হতো তাহলে তাকে টেস্ট করার জন্য যে ই.সি.জি মেশিন ছিল সেটা আমাদের দেয়া হতো না। কারণ ওটা ছিল কার্ডিওলজি ইউনিটের কাজ। বেশিরভাগ মানুষ আমাদের কাছে আসতো মেডিকাল ইমার্জেন্সি নিয়ে যেটা মানুষ এখন আইসিইউ তে দেখতে পায়। ওখান যে নার্সরা ছিল তারা সার্জিকাল ট্রেইনড ছিল, কারণ ওটা ক্যাজুয়াল সার্জারি ইউনিট ছিল, কনভাট করে সার্জারিকাল মেডিসিন করা হয়েছে। বেশিরভাগ পেশেন্ট তখন ছিল যারা বিষ খেয়েছে, তাদের ট্রীটমেন্ট করতে হতো।

এই সময় রোগীদের চিকিৎসায় আমি নিজস্ব চিন্তা থেকে অ্যাট্রোপিন দেয়া শুরু করি। এতে ম্যাজিকের মতো কাজ হয়। আমি অ্যাট্রেপিন ইনজেকশন কিনতাম, কিনে সারারাত ওটা পুশ করতাম দিতাম, তখন অ্যাট্রোপিন সরকারও দিত না বা রোগীরও হয়তো কেনার সামর্থ্য ছিল না। আমি যে বেতনটা পেতাম তার বেশিরভাগই চলে যেত অ্যাট্রোপিন কেনার পিছনে। পাশে ছিল মিটফোর্ড এলাকা থেকে ওটা কেনা হতো। কিনে এনে সারা রাত ধরে পুশ করতাম। ফাইনালি যখন আমি একজন রোগীকে বাঁচিয়ে তুললাম তখন মনটা আনন্দে ভরে যেত। আমার সহকর্মীরা প্রথমে নেতিবাচক ভাব দেখালেও পরে সবাই এটা প্রশংসা করেন। এমনকি মবিন স্যারকেও আমি বোঝাতে পারি। সাধারণ চিকিৎসায় একজন রোগীর মৃত্যুর পর তাকে আমি বিষয়টি বোঝাতে পারি।

অনেকদিন পর যখন মবিন খান স্যার এর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম তখন ভেবেছিলাম যে স্যার হয়তো আমাকে চিনতে পারবেন না। কিন্তু দেখলাম স্যার আমাকে ঠিকই চিনতে পেরেছেন। এতদিন পর কিভাবে চিনতে পারলেন এর কারণটা জানতে চাইলে স্যার বললেন, তোমাকে চিনতে পারব না, মনে নেই এক রোগীর অসুখ নিয়ে তুমি আমার ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলে।

এটা ছিল আমার জন্য একটা বিগ কমপ্লিমেন্ট।

অবশ্য এ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা আমি বিভিন্ন সময়ই করেছি। একটি পরীক্ষা করতে আমি সকলকে এক ধরনের খাবার খাইয়েছিলাম। তারপর রক্ত পরীক্ষা করেছিলাম এবং তাদের মধ্যে আমি ইউরিক এসিডের উপস্থিতি বেশি খুঁজে পেয়েছিলাম। এই বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে আমাদের একটি যৌথ লেখা প্রকাশিত হয়। লেখাটির শিরোনাম ছিল এফেক্ট অফ সোলার ইকিপস অন হিউম্যান ব্লাড।

আমি তখন আমার ইউনিটে কাজ করি সেই সাথে ঢাকা নার্সিং হোমে মেডিকাল অফিসার হিসাবে কাজ করতাম। এ সময় নানাভাবে আমি আয় করার চেষ্টা করি। একটি বাড়ির নিচতলা ভাড়া নিয়ে তাকে কনভার্ট করে অফিস বানিয়ে আমি প্রাকটিস করি। সেখানে আমার সঙ্গে অমল মিত্র থাকতো। আর একজন থাকতেন, তিনি ছিলেন ডেন্টিস্ট। অমল মিত্র আমার কাসমেট ছিল। আমি তাতে বলেছিলাম যে একা থাকাটা অসুবিধা, তাই সে আমার সাথে থাকত। আমাদের সামনের রুমটা ছিল অফিস আর পিছনের রুমে আমরা থাকতাম। নিউ কলোনির বাসাতে তখন বড় ভাই বিয়ে করেছিল। যেহেতু মাত্র দুইটা রুম ওখানে ছিল তাই বলা যায় যে আমার থাকার কোনো জায়গা ছিল না, আমি তখন মতিউর রহমান স্যার এর সঙ্গে অপারেশন করতাম। মগবাজারে আরোগ্য নিকেতন নামে একটি হাসপাতাল ছিল ওখানেও আমি যেতাম। পেশেন্ট দেখতাম ও অপারেশনে সাহায্য করতাম। তখনকার দিনে অর্থোপেডিক-এর খুব নামকরা একজন ডাক্তার ছিলেন তার অপারেশনেও আমি সাহায্য করতাম। আমি তখন বেতারে অভিনয় করতাম। টিভিতে অনুষ্ঠান করতাম।

এ ধরনের উপায়েই আমি অর্থ উপার্জন করতাম।

রেডিওতে তখন বিভিন্ন রকম প্রোগ্রামে আমি অংশ নিচ্ছি। একটা মনে হয় বিজ্ঞানের ওপর অনুষ্ঠান করতাম। এসব সূত্রেই টেলিভিশনে কাজ করার কিছু সুযোগ আমার হয়। আপনার ডাক্তার ও বিজ্ঞান বিচিত্রা নামে দুটো অনুষ্ঠানই করতাম। বিজ্ঞান বিচিত্রা অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পার্ট এর মধ্যে সেপারেটভাবে আমি একটি পার্ট করতাম আর ইব্রাহীম স্যার একটি পার্ট করতেন।

হাওয়ায় ভাসা ঘুড়ি

সমুদ্রের বালুতীরে অনেকে যতœ করে ঘর বানায় কিন্তু সে ঘর হঠাৎ আসা ঢেউয়ে ভেঙে যায়। তখন স্বপ্নগুলো উড়ে পালায় দূর সাগরে। সেই স্বপ্নকে খুঁজে পেতে মন চায় কিন্তু তাকে আর ধরা যায় না।

একদিন আমি হসপিটালে রাউন্ড দিচ্ছি এমন সময় শুনলাম, মিডল ইস্টে কাজের বিষয়ে একজন লোক এসেছেন। তার সেখানে একটা কোম্পানি আছে। তারা ডাক্তার চান। আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলা হলো।

তার সঙ্গে কথা বলার পর তিনি আমাকে বললেন, তুমি চলে আসো।

আমি বললাম, এখন ডাক্তার যেতে দেয় না, আমি কিভাবে যাব।

তিনি বললেন, কোনোভাবে যদি তুমি মিডল ইস্টে চলে আসতে পার তাহলে আমার কম্পানির মেডিকাল অফিসার হিসেবে জয়েন করতে পারবে।

আমি তাকে বললাম, তাহলে আমি পাসপোর্ট জোগাড় করতে থাকি।

আমি সেই সময় তীব্র হতাশার জন্য দেশ ছাড়তে চাইছিলাম। ডাক্তার হিসেবে আমার একটা বৈধ পাসপোর্ট ছিল, যেটা দিয়ে আমি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম। লেবার হিসেবে মিডল ইস্টে যাবার জন্য একটা আরেকটি পাসপোর্ট তৈরি করেছিলাম, নাম, ঠিকানা সব ঠিকই ছিল।

আমাকে বলা হলো, দাড়ি শেভ করা যাবে না।

 

শ্রমিক সেজে এয়ারপোর্টে হাজির হলাম। হঠাৎ এয়ারপোর্টে একজন আমাকে দেখে বলল, সালাহ্উদ্দীন ভাই আপনি? আপনার অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখলাম।

আমি তখন খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। আমি তাকে বললাল, আপনি আমাকে দেখেননি। অন্য কাউকে দেখেছেন।

সে জোর দিয়ে বলল, না, আমি আপনাকেই দেখেছি।

আমি জোর দিয়ে বললাম বললাম, আপনি আমাকে দেখেননি।

সৌদিতে পৌঁছানোর পর শেভ করলাম, কাপড় বদল করি। সঙ্গে একটা মাত্র শার্ট ছিল। ওটা পরলাম, আমার কাজ ছিল রিয়াদে। ওখানকার মূল কাজ ছিল মেডিকাল অফিসার হিসেবে কোম্পানির লেবারদের দেখা। কাজের চাপ ছিল না তেমন।

আমার মনে একটা ব্যথাও ছিল। নিউ কলোনির বাড়িটি আমার নামে ছিল। এর আগে কলোনির বাড়িটা বাবার নামে ছিল। বাবা মোহাম্মদপুরের বাড়িটি কোনো রকমে ভাড়া দিয়েছিলেন। তিনি যেহেতেু বাড়ি করছেন সেই যুক্তিতে তিনি কলোনিতে থাকবে পারবেন না। তাই আমার নামে কলোনির বাসাটির বরাদ্দ নেয়া হয়। আমি যখন পালিয়ে যাই তখন পলাতক হিসেবে লিস্টে আমার নাম উঠে। এমনকি নিউজ পেপারে এই খবর আসে। ফলে বাড়িটি দখলের জন্য অনেকে উঠে পড়ে লাগে।

আব্বা-আম্মাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। সে সময় এ মোহাম্মদপুরের বাড়িটা ভাড়া ছিল। আব্বা-আম্মা খুব অসহায় অবস্থায় পড়েন। তারা তখন আমাকে ফোন করেন। আমার নিজের অবস্থাই তখন খারাপ।

আমি তাদের বলি, আপনারা ব্যাংক থেকে লোন নিন বাড়ির জন্য, দেখি কি করতে পারি।

আমি সৌদি আরবে ছয় মাসের মতো কাজ করি ডাক্তার হিসেবে। এরপর আমেরিকা থেকে বিজ্ঞান বিষয়ক একটি সম্মেলনে অফার পাই। তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বৃটেনে আমার মেশিন নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে। আমার কাছে তেমন কোনো কাগজপত্র ছিল না। কারণ তারা সব পাঠিয়েছিল বাংলাদেশের ঠিকানায়। আমি কোনো রকমে আমেরিকা পৌঁছাই।

গিয়ে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার মুখে পড়ি। তারা আমাকে International Conference of Unity Science এর মডারেটর বানায়। আমি যেটা আগে জানতাম না। কারণ কাগজপত্র সব দেশেই ছিল। এখানে সারা বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে তাদের আবিষ্কারের ওপরে আলোচনা হয়। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা সেখানে হাজির হয়।

ওখানে আমি মডারেটর হলাম। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল থার্ড ওয়ার্ল্ডের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। আমি সেখানে বিজ্ঞানকে সহজলভ্য এবং সাধারণ মানুষমুখী করার প্রস্তাব করলাম।

আমেরিকায় আমি কোনো কাজ নিয়ে যাইনি। ফলে কিছুদিনের মধ্যে আমার টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেল। এমন অবস্থা হলো যে খাওয়ার কেনার অর্থও ছিল না। বাধ্য হয়ে একদিন ফুল হাতে পথে দাঁড়ালাম। ওটা বিক্রি করে যদি কিছু পাই। তখন আমি রাস্তায় ফুল বিক্রি করে জীবন চালিয়েছি। আমি ট্রেনে ঘুমাতাম। ভালোই লাগতো। কখনো কখনো গার্বেজ থেকে খাবার কুড়িয়ে খেয়েছি। কিন্তু কোনোদিন ভেঙে পড়িনি। এর মধ্যে অনেকে জেনে যায়, সেই মডারেটর বিজ্ঞানী এখন ট্রেনে থাকেন।

এরপর পিস একাডেমি আমাকে আশ্রয় দেয়। তারা আমাকে অর্থ দিয়েও সাহায্য করেছে। যার ফলে আমার বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছিল। এ সংস্থাটি ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সবার জন্য শান্তি’ এ নীতিতে বিশ্বাস করে। তখন আমি জানতাম না, কিভাবে মেডিকাল সায়েন্সে ঢুকবো। এর মধ্যে IRFF (International Relief Friendship Foundation) একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শূন্য পদে একজন ডাক্তার নিতে চায়। নিউ ইয়র্কে তাদের অফিস ছিল। আমি সেখানে যাওয়ার পর আমাকে কিম মায়লা নামে একজন চিনে ফেললেন এবং বললেন, তিনি ওই কনফারেন্সে ছিলেন। আমি ওখানে জয়েন করতে চাইলে ওরা খুবই খুশি হলো।

এটা ১৯৮২ সালের কথা। এরপর তাদের আমি আমার ভিসার অবস্থা সম্পর্কে বললাম। তারা তাদের আইনজীবীর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। তার মাধ্যমে আমি খেলোয়াড় এবং বিজ্ঞানীদের জন্য আমেরিকায় প্রচলিত ভিসা এইচ ওয়ান পাই। আমি আবার পড়ালেখা শুরু করি।

আমেরিকায় আমি নানা ধরনের কাজের মধ্যে জড়িয়ে পড়ি। একবার আমি একটা নার্সিং হোমে এজেন্সির মাধ্যমে কাজ পেয়েছিলাম। সেই এজেন্সি আমাকে দিয়েছিল একটা রোগী ম্যানেজ করতে। আমি নিজে থেকেই একটু খোঁজ করে দেখলাম রোগীটার সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না। তাকে যে ঔষধ দেয়া দরকার তা দেয়া হচ্ছে না। তারপর দেখলাম রোগী মারা গেছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করাতে একজন প্রশ্ন করলো, তুমি কে? তুমি কি ডাক্তার?

আমি তখন বললাম হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের একজন ডাক্তার।

মেডিকাল অ্যাডভাইজার আমি এইচ ওয়ান পেয়েই হয়েছিলাম। কিন্তু তারপর আফ্রিকাতে ওরা আমাকে পাঠাতে চাইল। দেশটি ছিল জিম্বাবুয়ে। ওরা আমাকে বলল যে আফ্রিকার একজন ডাক্তার এখানে নিয়ে আসবে আর আমাকে আফ্রিকায় নিবে। কিন্তু আমি রাজি হইনি।

আরেকটা কাজের কথা বলছি। তখন আমি মেডিকাল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট এ কাজ করছি। পয়সাটা ভালো পেতাম। সে হিসেবে আমি একটা বাড়ির বেসমেন্টে থাকা শুরু করলাম। একটা ঘর ছিল এটাচড বাথরুম, কিচেনটাও ঘরের মধ্যে। ভাড়া ছিল খুব সস্তা।

একবার আমার কলিগ মেডিকাল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট-এ যে মহিলা কাজ করত তাকে আমি দওয়াত করলাম।

ওকে আমি দাওয়াত করেছিলাম যেহেতু এটা বাঙালি স্বভাবে পড়ে। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমি রান্না করতে পারি না, পয়সাও নাই যে ভালো খাবার কিনে আনবো। তো আমি ভাত এবং তার সঙ্গে কিছু তরকারি রান্না করেছিলাম। আমি আশা করেছিলাম যে একজন আসবে। কিন্তু তারা এলো দুইজন। তার সঙ্গেই আসে আরেক তরুণী আমেরিকা। যে আমার জীবনের সঙ্গে পড়ে জড়িয়ে যায় চিরদিনের জন্য। তার নামটি দেশের সঙ্গে যেমন মিলে গিয়েছে তেমনি আমার ছন্নছাড়া জীবনে আমেরিকা নতুন দিক নিয়ে হাজির হয়। আমেরিকার সঙ্গে আমার বিয়ে এবং আমাদের মেয়ে জেসমিনের জন্ম আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।

একবার ঠিক করলাম আমরা শহর ছেড়ে চলে যাবো। আমাদের ছিল বেশ চমৎকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট। গাড়ি ছিল।

আমার এক পরিচিতের কাছে সব কিছু বিক্রি করে দিলাম। সবাই অবাক হলো। মোটামুটি একটি নিশ্চিত জীবন ছেড়ে স্ত্রী কন্যা নিয়ে আমি কোথায় ছুটছি।

আমার মেয়ে জেসমিন তখন খুব ছোট।

আমার স্ত্রীকে বললাম, আমরা অন্য জায়গায় যাব এবং সেখান থেকে নতুনভাবে শুরু করব।

আমি বাইরে গিয়ে গাড়ির মধ্যে জিনিসপত্র বাঁধলাম। জিনিসপত্রের মধ্যে জেসমিনের কিছু খেলনা এবং টুকটাক কিছু ছিল। তারপর আমার স্ত্রী আমাকে বললোÑ আমরা কোথায় যাব?

আমি বললাম, জানি না।

আমরা ঠিক করলাম যে শহর ভালো লাগবে সে শহরে আমরা সংসার পাতবো। আমাদের পথ চলা শুরু হলো। দেখার জন্য অনেক শহরেই থেমেছি এবং রাতগুলো হোটেলে কাটাতাম।

জানুয়ারির ২৭ তারিখ জেসমিনের জন্মদিন। সেদিনই মায়ামিতে এলাম। ঠিক করলাম, আর নয়, আমরা এখানেই থাকবো।

একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিলাম। ফার্নিচার বলতে কিছুই ছিল না। তবে আমাদের সেদিকে মন ছিল না। আমরা মেয়ের জন্মদিনে নতুন উপহার দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সে সময়টা একটু একটু করে টেনশন হতে লাগল। আমি ভাবলাম, যে কাজ কখনো করিনি তাই আজ করবো। এই ভেবে কিছু কাপড় নিয়ে আসলাম। এসে বসলাম জেসমিনের জন্য একটা জামা তৈরি করার কাজে। আমরা বসে প্রথমে জামার নকশা করলাম এবং তারপর হাত দিয়ে তা সেলাই করলাম। সে সব দিন ছিল সত্যিই অন্যরকম।

 

আমেরিকাতে এখন যেখানে থাকি সে বাড়িটার পাশে সুন্দর একটা লেক আছে। আর লেকের পাড়ে আমাদের যে বাড়ি, সে বাড়ির পাশে কোনো বাড়ি নেই। এটা কর্নার প্লট। সুইমিং পুল আছে। সেখানে পাখিরা আসে। ফ্যামিঙ্গো আসে বিভিন্ন সময়। আমি প্রথম ভাবতাম যে, এগুলো আসে কী করে এখানে, ঠিক এই জায়গায়। পরে জানলাম যে, এটা নির্মাতারা এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে এই জায়গাটার মধ্যে পাখি আসার সব উপকরণ থাকে। ওরা এগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করে। আমার বাসাটা খুব বড়ও না আবার খুব ছোটও না। বাড়িটা তৈরির সময় যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছি তা হলো, এটা যেন প্রকৃতির কাছাকাছি থাকে।

মজার বিষয় হলো, কোনো পাশ থেকে, কোনো বাড়ি থেকে মানুষ ভেতরটা দেখতে পায় না। এখানে বাইরের শব্দ নেই, শুধু পাখি আর পানির শব্দ। একটা ফোয়ারা আছে। সেই ফোয়ারার পাশে বিকেলবেলা বা রাত্রিরবেলা বসলে খুব ভালো লাগে। আমার বাসাটায় যে ঘরগুলো আছে সেগুলো সুইমিংপুলের দিকে মুখ করা। এয়ারকন্ডিশন্ড ঘর আমরা পছন্দ করি না। আমরা ন্যাচারাল বাতাসটা পছন্দ করি সেইজন্য সুইমিংপুলের দিকটা খুলে দিই। সমস্ত ঘরগুলোয় বাতাস থাকে।

আমাদের দুটো কুকুর আছে, আর একটা বিড়াল আছে। কুকুরের ঘরটা আমি আর আমেরিকা দুজনে মিলে করেছি। আমরা এমনভাবে থাকি যেন তা প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত হয়। আমার স্ত্রী প্রকৃতি পছন্দ করে, আমিও পছন্দ করি, আমার মেয়েও পছন্দ করে।

আমরা যখন একসঙ্গে বসি তখন আমরা বলি যে, আমরা কিছু জীবিত প্রাণ কথা বলছি। যে কথাগুলো আমরা বুঝতে পারি। তবে সৃষ্টির মধ্যে বেশিরভাগ শব্দ হয় সে শব্দগুলো আমরা বুঝতে পারি না। অনেকটা বোবা এবং শব্দহীন উচ্চারণের মধ্যে যে আনন্দ আছে সেটাকে যদি উপলব্ধি করা যায় তাহলে আরো বেশি প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া যায়। এটা আমরা সবসময় অনুভব করি ওখানে। আমরা ফুলের বাগান করি এবং আমরা দুজনেই ফুলের বাগান পছন্দ করি।

বাসার মধ্যে আমার একটা জায়গা আছে সেটাই আমার সবচাইতে প্রিয়। সেটা কর্নার। বন্দিজীবনে যখন ছিলাম চারপাশে দেয়াল ছিল। সেই থেকে আমি দেয়াল পছন্দ করি না। যত খোলা থাকে। সেজন্য দরজাটা খোলা থাকে এবং আমার পড়ার জায়গাটা ঠিক তেমনি।

আমি রান্না করি না। করতে পারি না। কারণ করার সময় পাওয়া যায় না। সকালে উঠে জানি কোথায় কী পাওয়া যায়। যেমন রোববারের দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকালবেলা ওঠে আমরা বলি যে, আচ্ছা চলো কোথায়া যাবো?

যেহেতু সে ভেনিজুয়েলান,ও বলে, চলো আমরা কোথায় গিয়ে অ্যারাইপা খাই।

অ্যারাইপা হচ্ছে এক ধরনের রুটি, যেটা ভেনিজুয়েলানরা খায়। আমরা এখন জানি সবচাইতে ভালো অ্যারাইপা কোথায় তৈরি হয় । আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সবচাইতে ভালো অ্যারাইপা যেখানে তৈরি হয় একটা গ্যাস স্টেশনে। বাসা থেকে সেখানে যেতে দশ পনের মিনিট লাগে গাড়িতে।

আমাদের সবচাইতে বড় জিনিস হলো, আমরা আনন্দের পাই বেঁচে থাকার জন্য। ছোটখাটো বিষয়ের মধ্যেও আমরা আনন্দ খুঁজে নি। আমরা করি কী, ওখানে ছোট ছোট দোকানগুলোতে, যেখানে মানুষ যেতে চায় না, ওইসব জায়গাতে আমরা দেখি যে ওখানে খুব ভালো কী পাওয়া যায়।

আমার মেয়ে জেসমিন আহমেদকে আমি মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনিয়েছি । সে আমার বন্দি জীবনের গল্পও জানে। ওরা বাংলাদেশে এসেছিল এবং এখানে এসে প্রায় ছয় মাসের মতো ছিল। সে সময় বাংলাদেশের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। এটা খুব সম্ভবত ২০০১ এর কথা। সে সময় এ উঁচু উঁচু বাড়িঘর ছিল না। আমি ওদের কক্সবাজার বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখনকার দিনে কক্সবাজার অতো ভালো হোটেলও ছিল না ট্রান্সপোর্টও এতো উন্নত ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে যে ভ্রমণটি ছিল ভালো-মন্দ এ দুটোর মাঝখানে। ওরা আমার সামনে তেমন কোনো মন্তব্য করেনি।

জেসমিন প্রিমেইডে পড়াশোনা করে। আমার মেয়ের যে ঘর, তার পড়াশোনার ব্যাপার এবং তার যে বড় হওয়াটা এটা আমাদের চোখের সামনে হচ্ছে। কিন্তু আমরা তার কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি না। একেকজনের একেকরকম মতামত থাকতে পারে। কিন্তু আমি এবং আমার স্ত্রী মনে করি যে, একটা মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আল্লাহতায়ালার দেয়া। ইট সুড নট বি এন্টারফেয়ার বাই সামবডি এলস। আমার মতো খাতে খাতে মিলিয়ে আরেকটা মানুষ তৈরি করার জন্য আমি এখানে আসিনি। আমার জীবনটাকে আমি যেরকম মনে করি, ব্রেক ছাড়া সাইকেল চালানো ছেলে আজকে কী করে মার্সিডিজের বেস্ট মডেল চালায় -এটা ঠিক আমার দ্বারা হয়নি। কেউ একজন এর পেছনে আছেন। আমার মনে হয় যে, আমরা যদি সবাই এটাকে বিশ্বাস করতে পারতাম ভালোমতো তাহলে আমাদের মধ্যে মারামারি হতো না।

আমি আমার মেয়েকে কখনোই গাইড করতে চাই না। আমি দেখছি সে নিজের মতো করে ভালো করছে।

আগের জীবনে দেখেছি যে, আমরা সারাদিন স্কুলে পড়াশোনা করে বাসায় এসে আবার খুব করে পড়াশোনা করতাম। এর মধ্যে নিশ্চয়ই ভালো জিনিস ছিল। এটা নো ডাউটও বলা যায়। ওখানে স্কুলে যখন যেত জেসমিন, তারপরে বাসায় এসে আর তার হাতে বই দেখতাম না। আমার কাছে খুব অবাক লাগতো। তখন জিজ্ঞাসা করতাম, তুমি এখন আসলে, বিকেল হয়ে গেল এখন সন্ধ্যার সময় বই নিয়ে বসো।

উত্তরে সে বলছে, আমার তো সবকিছু করে ফেলেছি।

তার সরল বক্তব্য স্কুলে গিয়েছে পড়াশোনা করার জন্য। অর্থাৎ স্কুলে যখন মানুষে যায় তখন সেখানেই সে পড়াশোনাটা করবে। বাসায় যখন আসবে তখন জীবনের সাথে সে সম্পৃক্ত হবে। বাসায় পড়ার প্রয়োজন হয় না।

এর মধ্যে অনেক দ্বিমত আছে কিন্তু আমার মতে, একটা মানুষের জ্ঞান কিন্তু বই দিয়ে হয় না, জ্ঞান বাস্তবে চলতে চলতে হয়। কাজেই অতিরিক্ত চাপে কাউকে যদি ব্যস্ত করা হয়, সেটা শিক্ষার জন্য খুব ভালো একটা দিক হয় এটা মনে হয় না।

 

স্বপ্ন ফেরি

একজন মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হলে তার ভেতরটা আগে বুঝতে হবে। নিজের বিশ্বাসকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া নয় বরং তার ভাবনাকে ঠিক রেখেই তার সামনে সামগ্রিক বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। যেন সে নিজ বিবেচনায় সব উপলব্ধি করতে পারে। যেন তার জানার জগতটা আরো বড় হয়ে ওঠে। একজন মানুষ তখনই বিশ্বাস করে যখন তাকে বড় করে তোলা হয় বা তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়া হয়।

আমি ১৯৯৪ সাল থেকে দুটো ইউনিভার্সিটিতে পড়াই। প্রাউডলি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অফ মেডিসিন। আমেরিকান লাইফে ছাত্র পড়ানোটা একটা বিশেষ আর্ট। কারণ ওখানে ছাত্ররা আমাদের দেশের ছাত্রদের মতো বিনয়ী বা ভক্তি সহকারে কিছু বলবে না, এরকম না। তারা আসে জ্ঞানের জন্য এবং তারা এজন্য প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। কাজেই জ্ঞান বিতরণ করতে গেলে আগে নিজের জানতে হবে। যদি না পারা যায়, তাহলে ওটা পড়ানো যাবে না। ধরা পড়ে যাবো এবং তারপর বেশিদূর যাওয়া যাবে না।

আমি প্রথম যেভাবে মেডিকাল টিচিংয়ে আসি, সেটা হলো খুব অদ্ভুতভাবে। আমি এমার্জেন্সির রুমে কাজ করছিলাম, এটা ফ্লোরিডার কথা বলছি। তখন ওখানে একজন ডাক্তার এসেছিলেন, তিনি নোভা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। তিনি আমার কাছে এসে বলেন, ড. আহমেদ, তুমি ছাত্র পড়াতে পছন্দ করো?

আমি বললাম যে, ইয়েস।

তিনি আমার বেশ ভালো বন্ধু, ভীষণ ব্যস্ত এক ডাক্তার। তখনকার দিনে মোবাইল ফোনের তেমন প্রচলন ছিল না। কাজ চালানোর জন্য বিপার ছিল। একটা বিপার মানুষে ব্যবহার করে, তার ছিল তিনটা বিপার। একদিকে টেলিফোনে কথা বলছেন, এদিকে বিপার বাজছে, ওদিকে দৌড়াচ্ছেন। আমিও ব্যস্ত ছিলাম এমার্জেন্সি রুমের মধ্যে। কাজেই তিনি কী বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু ও আমাকে কিছুক্ষণ পরপরই জিজ্ঞাসা করছে, আর ইউ শিওর, ইউ আর ডেফেনেটলি লাইক টু টিচ।

আমি বলছি, ইয়েস, ইয়েস আই অ্যাম, বলে চলে যাচ্ছি অন্য কাজের মধ্যে।

ওখানে স্টুডেন্টরা আসে ইমার্জেন্সি রুমে। তিনি দেখেছেন আমি পড়াতে পছন্দ করি। কিছুক্ষণ পরে আমরা ডাক্তাররা যেখানটায় বসি সেখানটায় তিনি আসেন। তখন টেলিফোন এগিয়ে দিয়ে আমাকে বলেন, প্লিজ টক।

টেলিফোনের ওইদিকে কে তা জানা হয়নি। আমি তখন টেলিফোনটা ধরে বললাম, হ্যালো।

ওদিক থেকে যেভাবে গলার স্বরে ‘হ্যালো’ বলা হলো তাতে বুঝলাম যে, নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ ব্যক্তিত্ব। এমার্জেন্সি রুমে আমাদের আচরণ অন্যরকম থাকে। তাড়াহুড়ো করে চট করে কথা বলা। কারণ এতো সময় তো নেই কারো। আমি বললাম, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি।

উত্তর এলো, তোমার যদি সময় থাকে, তুমি কালকে আসতে পারবে আমার ইউনিভার্সিটিতে? আই লাইক টু টক উইথ ইউ। এভাবেই শুরু।

আমরা ওখানে দশ ঘণ্টা কাজ করি এমার্জেন্সি রুমে। তারপর বের হতে পারতাম। পরদিন একটা সময় আমার ফাঁকা ছিল। আমি বললাম যে, ওকে, টুমোরো আই ক্যান গো।

তিনি আমাকে বললেন যে, ঠিক আছে তুমি চলে আসবে। দশটা-সাড়ে দশটার দিকে তুমি আসো, আই লাইক টু মিট ইউ।

আমি তার পরিচয় জানতে চাইলাম। তিনি পরিচয় দিলেন মেডিসিন বিভাগের ডিন হিসাবে।

টেলিফোনটা রাখার পরে আমি বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, এটা কী করলেন? আই ডোন্ট নো হোয়াইট ইজ ইট।

তিনি বলেন যে, তুমি পড়াতে পছন্দ করো। কাল নোভা ইউনিভার্সিটির ডিনের সঙ্গে কথা বলো।

তখন ওই মেডিকাল স্কুলটার নাম ছিল সাউথ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। আমি যখন ওখানে গেলাম তখন ডিন বললেন যে, ইউ আর হাইলি রিকমেন্ডেড বাই দি ফ্রেন্ড অফ মাইন্ড অ্যান্ড স্টুডেন্টস। ছাত্র এবং তার সহকর্মীরা আমাকে খুব পছন্দ করে।

আমি তাকে বলি, আমাকে কী করতে হবে।

তিনি বলেন, তোমার বিষয়ে তুমি ভালো জ্ঞান রাখো এবং তুমি ছাত্রদের পড়াতে ভালোবাসো।

আমি তখন এমার্জেন্সির কাজটা ছাড়তে রাজি ছিলাম না। তাকে বললাম যে আমি এর মধ্যেই সময় মতো পড়িয়ে দিয়ে যাবো কিন্তু আমাকে ফুল টাইম বেতন দিতে হবে।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম একথা বলার পর আমার চাকরি হবে না।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, ওকে।

ঠিক হলো সপ্তাহে তিন দিন আমি সেখানে পড়াবো। ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়োগে একটি বোর্ডের সামনে ইন্টারভিউ দিতে হয়। কিন্তু সে সময় তাদের জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তারা এমন একজনকে খুঁজছিল যে বিষয়গুলো ভালো মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সে হিসাবে তারা আমাকেই পছন্দ করেছিল।

 

হৃদয়ের বন্ধন

ভালোবাসা এমন এক শক্তি যা কোনো বাধা মানে না। মানুষের প্রতি মানুসের কিংবা পশুপাখির প্রতি মানুষের করার অনেক কাজ আছে। শুধু নিজের জীবন কাটানোই প্রকৃত জীবন হতে পারে না।

আমেরিকাতে ভোর পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আমরা প্রস্তুত হয়ে যাই। কুকুরদের খাওয়া-দাওয়া দিই। বিড়াল এবং কুকুরগুলো আমাদেরকে খুবই ভালোবাসে এবং আমরাও ওদেরকে খুব ভালোবাসি। মজার বিষয় হলো, আমি যখন অনেক দিন বাড়ির বাইরে থেকে ফিরি তখন তারা আগে থেকেই বুঝতে পারে আমি ফিরবো।

আমরা স্বামী স্ত্রী প্রতিদিন সময় মেনে অফিসে যাই। আমার স্ত্রী হলো অফিস ম্যানেজার। তার হাতে অনেক দায়িত্ব আছে। প্রথম একটা দায়িত্ব হলো, যে পেশেন্টগুলো আমি দেখি সারাদিনে সেসব পেশেন্টগুলোর রেফারলগুলো যায় তার হাত দিয়ে। রেফারলস হলো, চিকিৎসা করতে প্রথম যখন আমার কাছে আসবে তখন সে রোগীর সাথে আমার একটা চুক্তি বন্ধন হয়ে যায় যে, এখন থেকে সে পেশেন্টের অসুখের দায়দায়িত্ব আমার। চিকিৎসা করতে যেয়ে দেখা গেল যে একটা জিনিস আমার আয়ত্তের বাইরে তখন তাকে রেফারলস করতে হয়। এই রেফারলগুলো যদি সে পেশেন্ট না করে অথবা পেশেন্ট জায়গামতো যেতে না পারে তার পেছনে আমাকে থাকতে হয়।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট লিস্ট থেকে শুরু করে সব কিছু আলাপ করে নিই অফিসে যাওয়ার আগেই। সাড়ে ৮টার মধ্যে আমরা অফিসে পৌঁছে যাই। ৯টায় পেশেন্ট আসা শুরু করে। আমরা দুজনেই সাড়ে ৮টার সময় যেয়ে প্রথম যে কাজ করি তা হলো ঘরদোর পরিষ্কার করে ফেলি। তারপর পেশেন্ট যখন আসা শুরু করে পেশেন্টগুলোকে আমরা সেই মেডিকাল রেকর্ড থেকে তাদের সমস্ত তথ্য বের করা যায়।

যে প্রসঙ্গে এটা বলছিলাম যে, আমরা যখন সকালবেলা কাজে চলে যাই তখন আমরা জানতে চাই না যে, জেসমিন কী করছে, কোথায় যাবে, কী করবে? আমি একজন ডাক্তার। আমাদের কাজ অফিস শেষ হয়ে গেলেই শেষ হয়ে যায় না। অফিস শেষে যে সকল পেশেন্ট বেশি অসুস্থ তাদের বাসায় যাই। তাদের সঙ্গে আমরা স্বামী-স্ত্রী সময় দিই। এসব করার পরে যখন বাসায় ফিরে আসি তখন জেসমিনকে নিয়ে একসঙ্গে হয়তো খেলাম। অথবা আমরা একসঙ্গে বাইরে গেলাম, গিয়ে খেলাম। তারপরে চলে আসলাম। এখন এই যে বিষয়টা হলো এর মধ্যে আমি তো জানতে পারছি না যে আসলে জেসমিন কখন পড়াশোনা করছে। প্রশ্ন আসতে পারে, এই বিশ্বাসটা কোথা থেকে আসলো যে, সে ঠিকমতো থাকবে। দিস ইজ দি ফান্ডামেন্টাল দি প্রিন্সিপাল।

আমি প্রথম থেকেই, ছোটবেলা থেকেই ওকে আদর্শের যে কথাগুলো, ভালোর জন্য যে চেষ্টা- সেটা শুধু মুখে না, আমি তার ভেতর দেখতে পেয়েছি। আমার কথা ছিল, পড়াশোনা যদি করতে চাও তাহলে তোমাকে ধারাবাহিকতা রাখতে হবে এবং এর মধ্যে সবচেয়ে বড় জিনিস হলো, তুমি মুখস্থ বিদ্যা করো না। মুখস্থবিদ্যা বেশিদিন থাকবে না। আমার লেকচার যখন হয় তখন সে আমার ক্লাসে আসে। এটা ছোটবেলা থেকে আমি ব্যবস্থা করেছি এজন্য যে, সে যেন দেখতে পায় বাবা কীভাবে ক্লাস নেন সেটা সে জানতে পারবে। আমার অফিসে সে আসে। আমি পেশেন্ট দেখার পরে যে ডিকটেট করি সেটা ও টাইপ করে। সেটা করতে করতে সে পেশেন্ট সম্বন্ধে জানতে পারে। জোর করে না, ভালোবেসে নিয়ে এসেছি এভাবে, যাতে সে কাজটার মধ্যে নিজেকে পরিচিত করে তুলতে পারে। মাঝে মধ্যে ও যে লেখাগুলো লেখে সেগুলো আমাকে পড়তে দেয়। তখন আমি দেখি যে ওর মধ্যে যে গভীরতা আছে সেটা দিয়ে মনে হয়, ওর মধ্যে চিন্তার স্বাধীনতা প্রচুর আছে। আশা করি সেজন্যই ও হয়তো আরো এগিয়ে যেতে পারবে।

আমেরিকার বাইরে পারিবারিক টুর বলতে আমরা ফ্রান্স, কলম্বিয়া, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে গিয়েছি। আমি গান শুনি তবে খুব বেশি না কারণ মন খরাপ হয়ে যায়। মুভি বলতে বিদেশি মুভি দেখা হয়। আমি বই পড়ি। আমার সবচাইতে ভালো লাগে যে বইগুলিতে পজিটিভ দিকগুলোর প্রতি জোর দেয়া হয়। ডেল কর্নেগি আমার প্রিয় লেখক। তার সমস্ত বই আমার বিছানার পাশে থাকে। যত হাসি খুশি বই সেগুলো আমার ভালো লাগে। আমার তেমন কোনো হবি নেই। তবে ছাত্র পড়াতে ভালো লাগে এবং বলা যায় এটাই আমার হবি।

 

জীবনের রিলে রেস

মানুষের জীবনে কিছু অদ্ভুত সময় আসে যেটা সম্পর্কে আগে থেকে কোনো ধারণা করা যায় না। জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যায় তা আমরা ভাবতেও পারি না। জীবন যে কতো বিচিত্র হতে পারে যখন ভাবি তখন নিজের কাছেই বিস্ময় লাগে।

আমেরিকাতে আমি যে গাড়িটি চালাই সেটা একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ। যখন গাড়িতে চলি মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায়, আমার স্কুলজীবনে আমি যখন একটু সমর্থ হয়ে একটা সাইকেল কিনেছিলাম, সে সাইকেলটার কোনো ব্রেক ছিল না। আমার সাইজের তুলনায় সাইকেলটা ছিল একটু বেখাপ্পা ধরনের বড়। সাইকেলটা যখন চালাতাম তখন ওটায় উঠতে গেলে, আমি আগে দৌড় দিতাম সাইকেলের সঙ্গে, তারপর লাফ দিয়ে উঠতে হতো। সাইকেলের সামনে বিয়ারিং না থাকাতে ওটা নড়বড় করতো। তারপরও সাইকেল চলতো। কিন্তু সাইকেলের তো ব্রেক নাই। থামাতে যখন হবে তখন লাফ দিয়ে পড়তে হবে, পরে হ্যান্ডল ধরতে হবে। এই ছিল আমার সাইকেল।

যখন গাড়িটা চালাই আর ভাবি যে, ওই সাইকেল থেকে কোথায় আসলাম। তারপর আমার পরবর্তীতে মোটরসাইকেল হয়েছিল। মোটরসাইকেল চালাতাম। মোটরসাইকেলটা লাল রঙের ছিল। সবচেয়ে ছোট মোটরসাইকেল। সে হোন্ডা মোটরসাইকেলটা ধাক্কা দিয়ে দিয়ে চলতো। কিছুদূর যাওয়ার পর ওটা থেমে যেত। কেন যে থেমে যেত ওটা আমরা বুঝতাম না। ‘আমরা’ বলছি এজন্য যে আমার সঙ্গে কেউ না কেউ থাকতে হতো মোটরসাইকেলটা ধাক্কা দেয়ার জন্য। আহমদ আনিসুর রহমান ছিল আমার বন্ধু, নিউ কলোনিতে থাকতো। ওকে যখন আমার সঙ্গে যেতে বলতাম তখন ওর যদি তাড়া থাকতো তবে বলতো, না তোমার মোটরসাইকেলে আজকে যাবো না। আমার একটু তাড়া আছে।

আমি বলতাম, তোমার তাড়া কিসের?

বলে যে, তোমার মোটরসাইকেল ধাক্কা দিয়ে আমার যেতে অনেক সময় লাগবে।

অনেকটা রিক্রিয়েশনের মতো ছিল মোটরসাইকেলটা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া। সেখানে আমি এখন মার্সিডিজ গাড়ি চালাচ্ছি জিনিসটা ভাবলেই বড় বেখাপ্পা লাগে।

আমার প্রথম গাড়িটা বড় মজার ছিল। এই গাড়িটা আমাকে একজন দিয়ে দেয়। তখন আমি নিউ ইয়র্কে থাকতাম। তখন আমি একটা ‘নিউ ইয়র্কার’ বলে একটা হোটেল আছে সেখানে ছিলাম। সেখানে রাতে ঘুম হতো না দেখে আমি নিচে আসতাম, এসে চা খাওয়ার জন্য একটা দোকান ছিল কাছে, সেখানে যেয়ে এক কাপ কফি খেতাম। চায়ের সাথে কফি বিক্রি হতো সেখানে। একটা লোককে দেখতাম যে, সে ঝাড়বাতি পরিষ্কার করে। তার নাম ছিল রজার। রজার শ্বেতাঙ্গ একজন প্রবীণ, তার চুল সমস্ত পড়ে গেছে, মধ্যবয়সী বা একটু উপরে হতে পারে। ঝাড়বাতিগুলো ছিল অনেক বড় বড়। সে ঝাড়বাতিগুলো পরিষ্কার করতো। আমি যখন চা খেতে যেতাম যখন দেখতাম সে ওখানে তখন আমি তার সাথে হ্যালো করতাম।

আমেরিকাতে একটা জিনিস আমরা মেনে চলি। কারো দেখা হলে ‘হ্যালো, গুড মর্নিং’ বলা গেলেও ‘আপনি কী করেন?’ জাতীয় প্রশ্ন করাকে খুব বেয়াদবি বলে মনে করা হয়। এজন্য যে, আমি কি করি সেটা তোমার ব্যাপার না।

কাজেই আমি কখনো সেটা প্রশ্ন করিনি, সেও আমাকে কখনো প্রশ্ন করে না এবং করবেও না। আমি তাকে বললাম, আপনি চা খাবেন, চলুন আমরা চা খেতে যাই।

বললো, ওকে, লেটস গো।

আমি তার সাথে রাতের বেলা মাঝেমাঝে চা খেতে যাই, কফি খেতে যাই, তারপর চলে আসি। কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি যে, তুমি কোথায় থাকো, কী করো।

আমরা অনেক সময় নাটক নিয়ে কথা বলতাম। এখানে থিয়েটারে যে ড্রামাগুলো হয়, সেগুলোর টিকিট খুব বেশি দাম। রজার মাঝে মাঝে বলতো, তুমি চলো আমার সঙ্গে আমরা নাটক দেখি।

আমি বলতাম, আমার তো এতো টাকা নেই। এখন কী করে যায়।

সে আমাকে সস্তায় থিয়েটার দেখার পথ বাতলে দিতো।

আমি চিরকাল মনে করেছি রজার খুব গরিব মানুষ, কষ্ট করে এখানে ঝাড়বাতি ঠিক করে। একদিন আমাকে রজার বললো, বাংলাদেশ সম্পর্কে সে জানে।

মনে হলো সে আমার সম্পর্কেও অনেক বেশি জানে।

একবার রজার বললো যে, তুমি আমার বাসায় আসো একদিন।

বললাম, কোথায় থাকো?

আমি টিনাকে থাকি, নিউ জার্সিতে।

আমি বললাম, ঠিক আছে যাবো।

একদিন সময় ঠিক করলাম। ঠিকানাটা নিলাম। সে আমাকে তার বাড়ি যাওয়ার পথ বলে দিল।

আমি নিউ ইয়র্কে থাকতাম। রজারকে জিজ্ঞাসা করিনি যে, টিনাক কতদূরে? নিউ জার্সি কতদূরে? মোটামুটি সে যেভাবে বলেছে সেভাবে গেছি। যাওয়ার পরে যখন ঠিকানা মিলিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়াই তখন সেটা দেখে আমার মাথা ঘুরে গেছে। বিরাট ঝাঁকি খেয়েছি। এতবড় বাড়ি! বোধহয় একটা রুমের মধ্যে সে থাকে। তখনো কিন্তু আমি চিন্তা করছি আর যাচ্ছি। রজার তো কখনো এ বাড়ির মালিক হতে পারে না। তারপর আমি দেখি বাড়ির সামনে একটা রোলস রয়েলস রাখা। আরো কতকগুলো গাড়ি রাখা। বাগানবাড়ির মতো বিরাট বাড়ি। এখানে বোধহয় সে কাজ করে, সে নিশ্চয় এখানেও ঝাড়বাতি পরিষ্কার করে। তারপর ওখানে আমি গেটে বেল দিই। রজারই বেরিয়ে আসে।

আমি রজারকে বলি, দিস ইজ ইওর হাউস!

ইয়েস দিস ইজ মাই হাউস, কাম ইন, রজারের উত্তর।

আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাই, হু আর ইউ?

আই অ্যাম রজার। তার সেই একই উত্তর।

আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে আর বলছি, ইউ আর নট রজার। ইউ আর সামবডি এলস।

আই অ্যাম নট সামবডি এলস, আই অ্যাম রজার।

ওর বাড়িটা এতো বড়, বিরাট বাড়ি। পেছনে সুন্দর একটা জায়গা। ওখানে আমরা বসি।

ফলের শরবত হাতে নিয়ে বললাম, রজার তোমার এখানে এসে আমার খুব ভালো লাগছে। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে আই মিস সামথিং। আমার মনে হচ্ছে আমার মনে হচ্ছে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আরো বেশি জানা প্রয়োজন।

তখন রজার বললো, আমার অর্থের অভাব নেই। আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে ক্যান্সারে। এরপর থেকে আমার জীবনের প্রতি খুব একটা আগ্রহ নেই। আমি লেখক, আমার বই পাঠকপ্রিয়।

আমি বললাম, এই বাড়ি তুমি করেছো?

বললো যে, না, আমার মা ফিল্মে ছিলেন। বাবার প্রচুর সম্পদ। আমি ছাড়া তাদের আর কোনো ছেলেমেয়ে নাই। কিন্তু এখানে সারাদিন বসে থাকতে ভালো লাগে না।

আমি বললাম, নিউ ইয়ার্কার হোটেলে কেন কাজ করো।

তখন সে আমাকে বললো, তুমি কি জানো কোথায় তুমি থাকো। নিউ ইয়ার্কার হোটেলের মালিকরা নীরবে বিশ্ব শান্তির জন্য কাজ করছেন। অতএব আমি ভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে কাজ করছি ।

রজার বলে যে, ওখানে কেউ অহংকারী নয়। ওখানে অনেক লোক আছে যাদের অবস্থান সম্পর্কে তুমি ধারণাও করতে পারবে না।

তারপর কথায় কথায় আমি আরো মুগ্ধ হলাম।

আমার প্রথম গাড়িটা রজারের দেয়া। সে গাড়িটা ছিল টয়োটা থিয়ারা। খুবই ধড়ধড়ে ছিল, খুব একটা ভালো কন্ডিশনে ছিল না। কিন্তু ওর কাছ থেকে ওটা পেয়েছিলাম। গাড়িটার পেছনে মাত্র ১৫০ ডলার আমার খরচ হয়। গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য ১৫০ ডলার লাগে সেই সময়।

 

বাংলায় গান গাই

হৃদয়ে কিছু অনুভূতি জমা হয়ে থাকে যা প্রাণের ভাষা ছাড়া বোঝানো যায় না। দীর্ঘদিন আমেরিকা থেকেও বাংলার ওপর আর কিছুর জায়গা দিতে পারিনি। চাইও নি।

সম্প্রতি ঢাকায় গিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয় আমার। মুক্তিযুদ্ধের সময় বানানো সাইক্লোস্টাইল মেশিনের একটি প্রতিকৃতি সেগুন বাগিচায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আছে। সেখানে যাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি এবং সদস্য সচিব মফিদুল হক আমাকে স্বাগত জানান এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মকা- সম্পর্কে অবহিত করেন।

আমাদের কথা চলতেই হঠাৎ একজন মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। তিনি সে সময় বাংলাদেশে সফরে আসা উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসঙ্গীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর না দেখে কীভাবে যাই বলুন।

আমাদের নিয়ে মফিদুল হক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরিয়ে দেখান। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ত্যাগ, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্যাতনের চিত্র দেখার সময় এক আবেগঘন পরিবেশের তৈরি হয়।

আমার বানানো সাইক্লোস্টাইল মেশিনটি যে স্থানে রাখা আছে সেখানে গিয়ে মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা গোপন তথ্য পাচারের জন্য এই ধরনের হাতে বানানো সাইক্লোস্টাইল মেশিন ব্যবহার করতেন। আমাদের সৌভাগ্য, এখানে যে মেশিনটি আছে সেটা যিনি তৈরি করেছেন তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন।

তার বর্ণনায় আমার চোখে পানি চলে আসে। চেপে রাখা আবেগ নিয়ে মেশিনটি সম্পর্কে বর্ণনা করি। শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়সহ উপস্থিত সবাই সেই বর্ণনা শোনেন। পরিদর্শন শেষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ঘোরানো সিড়ি দিয়ে নেমে আসি সবাই।

ঠিক সেই মুহূর্তে প্রতুল মুখোপাধ্যায় হঠাৎ আমার হাত ধরে বলেন, আমি আপনার সম্মানে দু’কলি গান শোনাতে চাই।

চারদিকে তখন সবাই চুপ হয়ে যান।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় তার নিজস্ব স্টাইলে খালি গলায় গেয়ে ওঠেন,

 

আমি বাংলায় গান গাই,

আমি বাংলার গান গাই,

আমি আমার আমিকে চিরদিন

এই বাংলায় খুঁজে পাই।

 

আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন,

আমি বাংলায় বাঁধি সুর,

আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে

হেঁটেছি এতটা দূর।

বাংলা আমার জীবনানন্দ,

বাংলা প্রাণের সুখ,

আমি একবার দেখি বারবার দেখি

দেখি বাংলার মুখ।।

 

আমি বাংলায় কথা কই,

আমি বাংলার কথা কই,

আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি,

বাংলায় জেগে রই।

আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে,

করি বাংলায় হাহাকার,

আমি সব দেখে-শুনে ক্ষেপে গিয়ে করি

বাংলায় চিৎকার।

বাংলা আমার দৃপ্ত শ্লোগান,

ক্ষিপ্ত তীর-ধনুক,

আমি একবার দেখি, বারবার দেখি

দেখি বাংলার মুখ।

 

আমি বাংলায় ভালোবাসি,

আমি বাংলাকে ভালোবাসি,

আমি তারই হাত ধরে সারা পৃথিবীর

মানুষের কাছে আসি।

আমি যা কিছু মহান

বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়

মিশে তের নদী সাত সাগরের জল

গঙ্গায় পদ্মায়।

বাংলা আমার তৃষ্ণার জল,

তৃপ্ত শেষ চুমুক।

আমি একবার দেখি, বারবার দেখি,

দেখি বাংলার মুখ।

 

দুই কলি নয়, পুরো গানটি তিনি গেয়ে শোনান।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আঙ্গিনায় বিরাজ করে এক অপূর্ব পরিবেশ। গানটি যখন শেষ হয় অনেকের চোখেই তখন পানি চলে আসে। চোখ মুছতেই আমার অনেক সময় লেগে যায়।

 

 

সুতোর টানে

যখন সময় পাই চলে যাই মায়ামির সমুদ্র তীরে। সমুদ্রের ঢেউগুলো যখন এসে তীরে পড়ে তখন মনে পড়ে যায় অনেক ঘটনা।

মনে হয় কোথায় ছিলাম?

কোথায় এসেছি?

কোথায় যাবো?

চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমার শৈশব। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা। নির্যাতনের কথা।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রাজকীয় সম্মান পাওয়া

আবার পথে ফুল বিক্রি করার কথা।

 

প্রেরণা এবং হতাশা।

ভালোবাসা এবং ঘৃণা।

সম্মান এবং অপমান।

সফলতা এবং ব্যর্থতা।

আশা এবং নিরাশা।

 

সবই পেয়েছি ছোট এই জীবনে।

তারপরও সব কিছু ছাপিয়ে চোখের সামনে ভাসে আমার প্রিয় দেশ।

আমার বাংলাদেশ।

আমি ভাবি, কোন এক অদৃশ্য সুতোর টানে আমি ছুটে চলেছি।

কিন্তু তারপরও পেছন থেকে কে যেন আমাকে ডাকে।

 

মনের গহীনে কে যেন গেয়ে ওঠে,

কোন দিন আসিবে বন্ধু

কয়া যাও, কয়া যাও রে!

@copyright : Roots